সৌরশক্তির সেচে জেগে উঠছে নবীনগরের পতিত জমি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:২৭ অপরাহ্ণ

আধুনিক সোলার সেচব্যবস্থা ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দীর্ঘদিনের অনাবাদি জমিতে আউশ ধানের আবাদ শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলার পৌরসভার দোলাবাড়ী, সাতমোড়া, রতনপুর ও সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে নতুন করে আউশ ধান চাষ করা হয়েছে। এতে পতিত জমি চাষের আওতায় আসার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানো ও কৃষকের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তিতাস নদীর তীরবর্তী এলাকায় ফ্রিপ প্রকল্পের অর্থায়নে স্থাপন করা হয়েছে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা। উন্নতমানের ভূগর্ভস্থ বারিড পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বিনা মূল্যে উন্নত জাতের বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ দেওয়া হয়েছে। ফলে একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা জমিতে এখন ফলছে আউশ ধান।

দোলাবাড়ীতে ৭৫ বিঘা জমিতে আউশ

সরেজমিনে নবীনগর পৌরসভার দোলাবাড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে পাকা আউশ ধানের সোনালি শীষ দুলছে। গ্রামটিতে এবার প্রথমবারের মতো প্রায় ৭৫ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৯৮ ও ব্রি ধান-৪৮ জাতের আউশ ধানের আবাদ হয়েছে।

দোলাবাড়ী গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সরকারের সোলার সেচ স্কিমের কারণে এখন অল্প খরচে সেচসুবিধা পাচ্ছি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে আউশ চাষ করেছি। ফসলের অবস্থা খুব ভালো। আশা করছি, বাম্পার ফলন হবে।’

কৃষকদের মতে, সেচের খরচ কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে পানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আউশ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। এতে আগে চাষের বাইরে থাকা জমিও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে।

সংরক্ষিত বীজে বাড়ছে আবাদ

সাতমোড়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সফুরুল্লাহ জানান, গত মৌসুমে কৃষক মন্নান মিয়ার জমিতে বিনা ধান-১৯-এর প্রদর্শনী সফল হয়েছিল। এরপর তিনি সেখান থেকে পাওয়া বীজ সংরক্ষণ করেন। চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনী ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চুওরিয়া গ্রামে নতুন করে প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে।

চুওরিয়া গ্রামের কৃষক মন্নান মিয়া বলেন, ‘গত বছরের ভালো ফলনের কারণে সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করেছি। আমার কাছ থেকে আরও কয়েকজন কৃষক বীজ সংগ্রহ করে আউশ চাষ করেছেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত থাকায় এবার ফলনের সম্ভাবনাও অনেক ভালো।’

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রদর্শনী প্লটের সফলতা এবং কৃষকদের মধ্যে বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন জাত ও চাষপদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষকদের নতুন ফসল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

পানির অপচয় কমাচ্ছে সোলার সেচ

নবীনগর পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশনায় দোলাবাড়ী ব্লকে নতুন করে আউশ আবাদের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক সোলার সেচপ্রযুক্তির কারণে ভবিষ্যতে আরও অনাবাদি জমি আউশ চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে সোলার সেচ স্কিমের আওতায় দোলাবাড়ীতে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ৭৫ বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। উন্নতমানের বারিড পাইপলাইনের মাধ্যমে সেচের পানি সরবরাহ করায় পানির অপচয় কমেছে। একই সঙ্গে কৃষকদের সেচ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে নবীনগর উপজেলায় প্রায় দেড়শ বিঘা অনাবাদি জমিতে নতুন করে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। বোরো মৌসুম শেষে বন্যামুক্ত অনাবাদি জমিতে স্বল্পমেয়াদি আউশ ধানের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য।

পতিত জমিতে বাড়ছে উৎপাদনের সম্ভাবনা

নবীনগরের এই উদ্যোগে অনাবাদি জমিকে কৃষিকাজে ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সোলার সেচ, উন্নত সেচপদ্ধতি, কৃষি উপকরণে সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ে পরামর্শের সমন্বয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও ফসলের আবাদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, সেচব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখা, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং উপযুক্ত জমি নির্বাচন করা গেলে ভবিষ্যতে আরও পতিত জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হতে পারে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন