ইসরায়েলের নির্দেশনায় ৩১ দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:২৯ অপরাহ্ণ

ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে বাংলাদেশসহ ৩১টি দেশের নাগরিক ও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব দেওয়া বন্ধ করেছে ফরাসি বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স। যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের নাগরিকত্বের ভিত্তিতে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনকি ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা কর্মীদেরও অন্য নাগরিকত্ব নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকলে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বিমান সংস্থাটি।

ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই শনিবার (১০ অক্টোবর) এ তথ্য জানায়।

মিডিয়াপার্টের হাতে আসা এয়ার ফ্রান্সের একটি অভ্যন্তরীণ বার্তা অনুযায়ী, ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশকারী ফ্লাইটের কোনো ক্রুর এমন দেশের নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা চলবে না, যে দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

এই নির্দেশনার ভিত্তিতে এয়ার ফ্রান্স ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ছাড়াও আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের মতো দেশের নাগরিকেরা এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে তালিকায় রয়েছে ৩১টি দেশের নাগরিকত্ব।

নির্দেশনায় কোনো ধর্মের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থাকায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিশেষ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে, নিরাপত্তার যুক্তিতে নেওয়া এই ব্যবস্থা কার্যত জাতীয়তার ভিত্তিতে কর্মীদের আলাদা করছে।

এই বিধিনিষেধের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ফরাসি নাগরিকত্ব থাকলেও তাঁরা ছাড় পাচ্ছেন না। কারও দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত কোনো দেশের হলে তাঁকেও ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কর্মীদের দ্রুত তাঁদের নাগরিকত্বের তথ্য জানাতে বলেছে এয়ার ফ্রান্স। নির্দেশনা না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তের ফলে কর্মক্ষেত্রে জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও একজন কর্মীকে তাঁর অন্য নাগরিকত্বের কারণে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

তবে এ বিষয়ে এয়ার ফ্রান্স এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এন১২-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনাটি জারি করে। ইসরায়েলের দাবি, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনাটি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে ক্রু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রুটে দায়িত্ব পালন করে আসা কিছু পাইলট ও কেবিন ক্রুর দায়িত্ব পালনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

নতুন বিধিনিষেধের পেছনে একটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ওমানি সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং সেটিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের টার্মিনালে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে।

ওই অভিযোগের পর বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর পরপরই ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনা জারি করে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ওঠা অভিযোগ এবং ৩১ দেশের নাগরিকদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা থাকলেও নাগরিকত্বের ভিত্তিতে এত বড় পরিসরে কর্মীদের বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, দেশটির অন্তত একটি বিমান সংস্থা প্রায় ২ হাজার ৫০০ পাইলট ও কেবিন ক্রুর অতীত ইতিহাস যাচাই শুরু করেছে।

এ উদ্যোগও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যাচাইয়ের আওতায় থাকা কর্মীদের পরিচয়, যাচাইয়ের নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং এর ভিত্তিতে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তার নামে কোনো কর্মীকে তাঁর নাগরিকত্বের ভিত্তিতে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হলে সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এয়ার ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে, কারণ বিধিনিষেধের আওতায় পড়ছেন ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা কর্মীরাও। তাঁদের অন্য নাগরিকত্বের কারণে দায়িত্ব পালনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমান কর্মসংস্থানের অধিকার ও বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদনে এ সিদ্ধান্তের কারণে ফরাসি বিমান সংস্থাটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলার চূড়ান্ত ফলাফল বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এয়ার ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং কর্মীদের সমান অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

তথ্যসূত্র: মিডিয়াপার্ট, মিডল ইস্ট আই ও আনাদোলু এজেন্সি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন