সঞ্চয়পত্রে ফিরছে বিনিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:২০ অপরাহ্ণ

বেশি সুদের আশায় ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন নেত্রকোনার কলমাকান্দার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোক্তার হোসেন। দীর্ঘদিন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পর একসময় ব্যাংকের আমানতে ঝুঁকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও ফিরেছেন সরকারি এ সঞ্চয়মাধ্যমে। অবসরজীবনের নিয়মিত ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তার এ সিদ্ধান্ত। শুধু মোক্তার হোসেন নন, মুনাফার আকর্ষণ ও ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি বিবেচনায় সঞ্চয়পত্রে নতুন করে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিক্রির পরিসংখ্যানেও। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এতে একদিকে সরকারি সঞ্চয়মাধ্যমটির প্রতি বাড়তি আগ্রহের চিত্র ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় সিদ্ধান্তে মুনাফা ও নিরাপত্তার গুরুত্বও সামনে এসেছে।

  • দুই মাসে নিট বিক্রি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
  • জুলাই-আগস্টে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ
  • ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি ও আকর্ষণীয় মুনাফায় বাড়ছে আগ্রহ

দুই মাসে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৯১ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

এর মধ্যে জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধের তুলনায় ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বেশি ছিল। আগস্টে নিট বিক্রি হয়েছে ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ফলে অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট অর্থপ্রাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বলতে নতুন বিক্রির বিপরীতে আগের বিনিয়োগের আসল পরিশোধ সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট অর্থকে বোঝায়। ফলে এ পরিসংখ্যান শুধু বিনিয়োগের প্রবণতা নয়, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহের চিত্রও তুলে ধরে।

মুনাফার আকর্ষণ ও নিরাপত্তার বিবেচনা
মোক্তার হোসেন জানান, পেনশনের অর্থের পাশাপাশি জমি বিক্রির টাকা ব্যাংকে রেখেছিলেন সংসারের খরচ মেটানোর জন্য। কিন্তু ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আবারও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন তিনি। তার কাছে নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার পাশাপাশি সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ প্রবণতাকে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে মুনাফার হার, বিনিয়োগের মেয়াদ, নগদায়নের সুবিধা ও অর্থের নিরাপত্তা—সবকিছুই প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে নির্দিষ্ট শর্তে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। চলতি জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে বিদ্যমান মুনাফার হার বহাল রেখেছে সরকার। ফলে নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছে সঞ্চয়পত্র আকর্ষণীয় থাকতে পারে।

আগের অর্থবছরের দুর্বল প্রবণতা কাটানোর ইঙ্গিত
চলতি অর্থবছরের আগে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ সংগ্রহ ছিল তুলনামূলক কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। অথচ মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রথম দুই মাসে নিট বিক্রির উল্লম্ফন সরকারের ঋণ সংগ্রহের হিসাবে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। তবে বছরের বাকি সময়ে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও নতুন বিক্রির বিপরীতে আসল-মুনাফা পরিশোধের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। জুলাই শেষে তা ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতাই মূল বিবেচনা
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহে সহায়ক হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বুঝতে আরও সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে আস্থা ধরে রাখা এবং সঞ্চয়কারীদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়া মানেই ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ অর্থ সরে আসা নয়।

সব মিলিয়ে, মুনাফার আকর্ষণ, নিরাপত্তার বিবেচনা ও বিনিয়োগকারীদের পছন্দের পরিবর্তনে সঞ্চয়পত্রের বাজারে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সরকারি ঋণ সংগ্রহে সঞ্চয়পত্রের ভূমিকা বাড়তে পারে। তবে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র—উভয় ক্ষেত্রেই আস্থা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই হবে দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়কারীদের স্বার্থ রক্ষার প্রধান শর্ত।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন