স্মার্টফোন, অনলাইন গেম ও মাদকের ঝুঁকি থেকে শিশু-কিশোর ও তরুণদের দূরে রেখে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কাজ করছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বেটখৈর গ্রামের ‘শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগার’। স্থানীয় শিক্ষক ও তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পাঠাগার এখন গ্রামের নতুন প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা ও অবসর কাটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিন বিকেল গড়ালেই পাঠাগারে ভিড় করেন শিশু-কিশোর ও তরুণেরা। কেউ পড়ে রূপকথা, গল্প ও উপন্যাস, কেউবা ইতিহাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা কিংবা ধর্মীয় বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে নানা বিষয়ে জানার সুযোগ পেয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বই পড়ার আগ্রহ।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সিমাবাড়ী ইউনিয়নের এই গ্রামীণ পাঠাগারে বর্তমানে রয়েছে চার হাজারের বেশি বই। প্রত্যন্ত এলাকায় জ্ঞানচর্চার এমন পরিবেশ স্থানীয় শিশু-কিশোরদের সময় কাটানোর ধরনেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে।
৫০০ বই দিয়ে যাত্রা, এখন সংগ্রহ চার হাজারের বেশি
২০২২ সালে স্থানীয় শিক্ষক কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইনের উদ্যোগে পাঠাগারটির যাত্রা শুরু হয়। কয়েকজন উদ্যমী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে পাঠাগারের জন্য জায়গার ব্যবস্থা করেন। সরকারি গ্রন্থাগার দপ্তরের পরামর্শে প্রাথমিকভাবে ৫০০ বই নিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম।
পরে বিভিন্ন সুধীজন, প্রকাশনা সংস্থা ও একুশে বইমেলা থেকে বই সংগ্রহের মাধ্যমে পাঠাগারের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঠাগারটি পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানচর্চার সুযোগ
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইন বলেন, আকাশসংস্কৃতির এই যুগে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও মানুষের জানার পরিধি বিস্তৃত হওয়া জরুরি। তরুণ ও শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁদের এই প্রচেষ্টা।
তাঁর মতে, বইয়ের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি হলে তাদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে অবসর সময়কে জ্ঞান অর্জনের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় পাঠাগারটির কার্যক্রম। জাতীয় দিবস উদ্যাপনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয় এখানে। সম্প্রতি নজরুলজয়ন্তী উৎসবে উপস্থিত হয়ে পাঠাগারের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু। তিনি পাঠাগারটির জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করেন।
- বাবার চাপে এসে এখন বই পড়তেই ভালো লাগে
পাঠাগারে নিয়মিত আসা খুদে পাঠক তামিমের অভিজ্ঞতাও বদলে যাওয়ার গল্প বলে। শুরুতে বাবার চাপে পাঠাগারে এলেও এখন বই পড়ার আনন্দই তাকে সেখানে টেনে আনে। মোবাইল ফোনের পরিবর্তে বইয়ের পাতায় সে খুঁজে পেয়েছে নতুন আকর্ষণ।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুমাইজিদের মতে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞান তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিশুদের এমন আগ্রহ পাঠাগারটির উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। তবে পাঠকসংখ্যা ও বইয়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সামনে আসছে।
প্রয়োজন আরও বই, আলমারি ও সৌরবিদ্যুৎ
আয়োজকদের মতে, পাঠকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পাঠাগারটিতে অন্তত ১০ হাজার বই প্রয়োজন। পাশাপাশি বই সংরক্ষণের জন্য আরও আলমারি ও র্যাক দরকার। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা ভবিষ্যতে নিজ অর্থায়নে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে পাঠাগারের জন্য স্থায়ী কক্ষ বরাদ্দের পরিকল্পনা করছেন। এতে বই সংরক্ষণ, পাঠকদের বসার জায়গা এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিটি ইউনিয়নে পাঠাগার গড়ার পরিকল্পনা
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, বর্তমান সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার ফলে তরুণ সমাজে অবক্ষয় ও মাদকাসক্তি বাড়ছে। তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদে ছোট পরিসরে হলেও পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেটখৈর গ্রামের শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগার দেখাচ্ছে, স্থানীয় উদ্যোগে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা গেলে প্রত্যন্ত এলাকাতেও শিশু-কিশোর ও তরুণদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। তবে এই উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী করতে বইয়ের সংগ্রহ বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নিয়মিত পাঠক তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

বগুড়া সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ