পাকিস্তানের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান আকবর রাজা বলেন, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া তাঁদের অধিকার। এ বিষয়ে দলের যুক্তি ও প্রমাণ ভবিষ্যতে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে দলটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। প্রদেশটিতে পিটিআই নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালিত কার্যক্রমের ওপর এর প্রভাব পড়েছে।
জরুরি অবস্থা ঘিরে কেন্দ্র ও পিটিআই মুখোমুখি
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেয়। এর ফলে প্রদেশটিতে পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এ পদক্ষেপের পেছনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি সামনে আনা হলেও পিটিআই সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করছে। দলটির নেতাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধটি আইনি লড়াইয়ে গড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়া পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশ। প্রদেশটির কয়েকটি জেলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেও পিটিআইয়ের সঙ্গে বিরোধের কারণে পরিস্থিতি রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
সমঝোতার চেষ্টা করছেন মাওলানা ফজলুর রহমান
কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে চলমান বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-পাকিস্তানের (জেইউআই-এফ) নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে উভয় পক্ষই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পিটিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সালমান আকবর রাজা দাবি করেন, মাওলানা ফজলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকার আলোচ্যসূচি পরিবর্তন করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় সমঝোতা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থান থেকে সরে আসেনি পিটিআই।
‘রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেই’
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তালাল চৌধুরী বলেন, ‘দ্য ফার্স্ট ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ বা প্রথম জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় সব রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ফলে পাকিস্তানে শান্তি ফিরে এসেছিল। তাঁর মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় জরুরি।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার কয়েকটি জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষ বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা জানাজা আয়োজন করতেও সমস্যার মুখে পড়ছেন।
প্রদেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ও সেফ সিটি প্রকল্প চালু করতে পারেনি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে এসব অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
পিটিআই সরকারের বিরুদ্ধে মরিয়ম নওয়াজের সমালোচনা
খাইবার পাখতুনখাওয়ার পিটিআই নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ। পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার উন্নয়ন কার্যক্রমের তুলনা করে তিনি অভিযোগ করেন, প্রদেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপশাসন ও উন্নয়নের ঘাটতি চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মরিয়ম পাঞ্জাবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গণপরিবহন, পয়োনিষ্কাশন ও অবকাঠামো খাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। একই ধরনের উন্নয়ন খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন হয়নি, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মরিয়মের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই প্রদেশের পার্থক্যের কারণ শুধু সম্পদের প্রাপ্যতা নয়; প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও দুর্বল প্রশাসনের কারণে খাইবার পাখতুনখাওয়া নানা সমস্যার মুখে পড়েছে।
প্রদেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে জনসেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়, সরকার পরিচালিত হয় কাজ, কাজ আর কাজ দিয়ে।’
তবে দুই পক্ষের এসব বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কথা তুলে ধরছে, অন্যদিকে পিটিআই গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পেশোয়ারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা, সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারির পর সড়ক অবরোধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে জনজীবনেও। ১২ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার সড়ক অবরোধের কারণে প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল।
১৩ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার পেশোয়ারের সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন শহরের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)। এ বিষয়ে কোনো ভুয়া বিজ্ঞপ্তি বা গুজবে কান না দিতে জনগণকে সতর্ক করেছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে পেশোয়ারে সাত দিনের জন্য সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন বলে ডনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার ডেরা ইসমাইল খান জেলার সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখেও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিনের নির্ধারিত পরীক্ষাগুলোও বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কোন পথে?
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের বিরোধ এখন আইনি ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পিটিআই আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, আর সরকার বলছে, প্রদেশটিতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়, বরং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নই তাদের লক্ষ্য।
এ পরিস্থিতিতে মাওলানা ফজলুর রহমানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা সম্ভব না হলে বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে আদালতের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি প্রদেশটির প্রশাসনিক পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রাদেশিক প্রশাসনের প্রশ্ন যুক্ত হওয়ায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এখন পিটিআইয়ের আইনি পদক্ষেপ, কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান এবং মধ্যস্থতার উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয়ই খাইবার পাখতুনখাওয়ার সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কালের আলো/এসএ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ