টেস্ট ইতিহাসে প্রথম লিটন, ব্যাটিংয়ের সঙ্গে উইকেটকিপিংয়েও বিশ্বরেকর্ড

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:০৮ অপরাহ্ণ

টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক ব্যাটার লিটন কুমার দাস। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসেই পঞ্চাশোর্ধ রান করার পাশাপাশি উইকেটের পেছনে ৯টি ডিসমিসাল করে বিরল এক কীর্তি গড়েছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই ইনিংসে অন্তত একটি করে অর্ধশতক এবং ৯টি ডিসমিসালের নজির আগে ছিল না।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবি টেস্টে লিটনের এই অসাধারণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় প্রাপ্তি, তেমনি ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যাট হাতে ৫৩ ও ১০২ রানের ইনিংস খেলার পর উইকেটকিপিংয়েও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। দুই ইনিংসে তাঁর এই পারফরম্যান্স টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ডবুকে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

এবাদতের বলে দুর্দান্ত ক্যাচ, ভাঙল আফগানিস্তানের জুটি

ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইকরাম আলিখিলকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে স্বস্তি এনে দেন লিটন। এবাদত হোসেনের প্রায় ওয়াইড হয়ে যাওয়া বলে ব্যাট চালাতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ তুলে দেন আফগান ব্যাটার। নিজের শরীর বাঁকিয়ে ও ঝুঁকি নিয়ে দূরে সরে যাওয়া বলটি তালুবন্দি করেন লিটন।

ক্যাচটি ছিল কঠিন, আর ম্যাচের পরিস্থিতিতে সেটির গুরুত্বও ছিল অনেক। ইকরামকে ফিরিয়ে আফগানিস্তানের ৬৬ রানের জুটি ভেঙে দেয় বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে ম্যাচে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয় টাইগারদের সামনে।

এবাদতের বলে লিটনের এমন অসাধারণ ক্যাচ অবশ্য এই ম্যাচে প্রথম নয়। প্রথম ইনিংসেও তাঁর নেওয়া একটি দৃষ্টিনন্দন ক্যাচ আলোচনায় এসেছিল। এবার দ্বিতীয় ইনিংসেও একই বোলারের বলে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে নিজের উইকেটকিপিং দক্ষতার প্রমাণ দিলেন বাংলাদেশের এই তারকা।

ডেনিস লিন্ডসের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন লিটন

লিটনের এই কীর্তির আগে টেস্ট ক্রিকেটে একই ম্যাচের দুই ইনিংসে অন্তত অর্ধশতক করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৮টি ডিসমিসালের রেকর্ড ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক উইকেটকিপার ডেনিস লিন্ডসের দখলে।

১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জোহানেসবার্গ টেস্টে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ রান করার পাশাপাশি ৮টি ডিসমিসাল করেছিলেন লিন্ডস। দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা সেই রেকর্ড এবার ছাড়িয়ে গেলেন লিটন।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে চলমান টেস্টে দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৫৩ ও ১০২ রান করেছেন তিনি। একই সঙ্গে উইকেটের পেছনে ৯টি ডিসমিসাল পূর্ণ করে নতুন রেকর্ড গড়েছেন বাংলাদেশের এই ক্রিকেটার। ব্যাটিং ও উইকেটকিপিং—দুই ক্ষেত্রেই এমন ধারাবাহিকতা টেস্ট ক্রিকেটে বিরল।

৪৭৯ রানের লক্ষ্য তাড়ায় চাপে আফগানিস্তান

ম্যাচে বাংলাদেশ আগে ব্যাট করে বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় এবং আফগানিস্তানের সামনে জয়ের জন্য ৪৭৯ রানের লক্ষ্য দেয়। আগের দিন খেলা শেষ হওয়ার সময় দ্বিতীয় ইনিংসে আফগানিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ১৩২ রান।

পঞ্চম ও শেষ দিনে মাঠে নামার আগে জয়ের জন্য আফগানিস্তানের প্রয়োজন ছিল আরও ৩৪৭ রান। অন্যদিকে বাংলাদেশের দরকার ছিল ৭ উইকেট। ফলে ম্যাচের শেষ দিনে দুই দলের সামনে ছিল ভিন্ন লক্ষ্য—বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করা, আর আফগানিস্তানের হার এড়িয়ে ম্যাচ বাঁচানো।

আফগান ব্যাটাররা শুরুতে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বাংলাদেশের বোলারদের মোকাবিলা করছিলেন। মাঝপথে অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহীদি পায়ে আঘাত পেয়ে রিটায়ার্ড হার্ট হলেও তাঁদের লড়াই থেমে থাকেনি। তবে ইকরাম আলিখিলের উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশের সামনে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

জয়ের আশায় বাংলাদেশ, ড্র বাঁচানোর লড়াই আফগানদের

ইকরাম আলিখিল আউট হওয়ার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ২০২ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় আফগানিস্তান। একদিকে বাংলাদেশের বোলাররা দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে জয় নিশ্চিত করতে চাইছিলেন, অন্যদিকে আফগান ব্যাটারদের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব সময় কাটিয়ে ম্যাচ ড্রয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইনিংসে এবাদত হোসেন তিনটি এবং হাসান মাহমুদ একটি উইকেট নিয়েছেন। বাকি উইকেটগুলো তুলে নিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে আফগানিস্তানের হাতে উইকেট থাকায় ম্যাচের ফল নির্ধারণে শেষ দিনের বাকি সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

লিটনের রেকর্ডে বাড়তি প্রাপ্তি বাংলাদেশের

টেস্ট ক্রিকেটে উইকেটকিপারের ভূমিকা শুধু ক্যাচ নেওয়া বা স্টাম্পিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতেও অবদান রাখতে হয়। লিটন দাসের এই ম্যাচের পারফরম্যান্সে দুই দায়িত্বেরই অসাধারণ সমন্বয় দেখা গেছে।

প্রথম ইনিংসে অর্ধশতক, দ্বিতীয় ইনিংসে শতক এবং দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯টি ডিসমিসাল—সব মিলিয়ে আবুধাবি টেস্টে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও এটি গর্বের অর্জন।

তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি ম্যাচের ফলও এখন বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। লিটনের ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের দিনে দল শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন