মেমোরি চিপের সংকটে স্মার্টফোনের বাজারে ১৪ বছরের রেকর্ড ধস

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:০৩ অপরাহ্ণ

মেমোরি চিপের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন সরবরাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ বছরের মধ্যে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এবারই স্মার্টফোন সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ বাড়ায় মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এআই খাতে চিপের ব্যাপক ব্যবহার স্মার্টফোন নির্মাতাদের সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে স্মার্টফোনের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারদামে।

এআইয়ের চাহিদায় চিপের সংকট, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অবকাঠামো ও প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে চিপ উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে স্মার্টফোন নির্মাতারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন।

চিপের সরবরাহ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি নির্মাতাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে স্মার্টফোনের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আবার কিছু নির্মাতা উৎপাদন ও সরবরাহ কমিয়ে বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে মুনাফা ধরে রাখার কৌশল অনুসরণ করছে।

এতে একদিকে বিশ্ববাজারে স্মার্টফোনের সরবরাহ কমছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের জন্য নতুন ফোন কেনার খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাজারে শীর্ষে স্যামসাং, তবু সরবরাহ কমেছে

বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন সরবরাহ কমলেও তৃতীয় প্রান্তিকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্যমতে, এ সময় বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারের ২৩ শতাংশ ছিল প্রতিষ্ঠানটির দখলে।

গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ সিরিজের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং মধ্যম দামের স্মার্টফোন তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের তুলনামূলক স্থিতিশীল সরবরাহ স্যামসাংকে এগিয়ে থাকতে সহায়তা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বাজারে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহে পতন হয়েছে। গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় স্যামসাংয়ের স্মার্টফোন সরবরাহ কমেছে ৩ শতাংশ।

অ্যাপলের বাজার হিস্যা ২২ শতাংশ

স্যামসাংয়ের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপল। তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্ব স্মার্টফোন বাজারের ২২ শতাংশ দখলে ছিল প্রতিষ্ঠানটির।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর আইফোন ১৭ সিরিজের সব মডেল বাজারে এলেও চলতি বছর আইফোন ১৮ সিরিজের সাধারণ মডেলটি বাজারে আসেনি। ফলে নতুন আইফোন বাজারে ছাড়ার প্রথম মাসে বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কম ছিল।

স্মার্টফোন বাজারে অ্যাপলের অবস্থান শক্তিশালী থাকলেও নতুন মডেল বাজারে আসার সময়সূচি সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহে বড় পতন

মেমোরি চিপের সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে কয়েকটি চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্যমতে, তৃতীয় প্রান্তিকে অপো ও ভিভোর স্মার্টফোন সরবরাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। শাওমির সরবরাহ কমেছে ৩০ শতাংশেরও বেশি।

মুনাফা ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে শাওমি কম দামের স্মার্টফোনের বাজারে নিজেদের কার্যক্রম সীমিত করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি বিদেশি বাজারে ব্যবসার পরিসরও কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্লেষকদের মতে, যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে গেলে কম দামের স্মার্টফোন তৈরি ও বিক্রি করে আগের মতো মুনাফা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে নির্মাতারা উৎপাদন কমানো কিংবা তুলনামূলক বেশি দামের মডেলের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেট ফোনের ক্রেতাদের বিকল্প আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

পুরোনো ফোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শিলপি জৈন বলেন, ক্রেতারা প্রত্যাশার তুলনায় দীর্ঘ সময় পুরোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। তাঁদের অনেকে নতুন ফোন কেনার পরিবর্তে সংস্কার করা ব্যবহৃত স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামের ও উন্নত সুবিধাসম্পন্ন ফোনের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।

এই প্রবণতা স্মার্টফোন বাজারে নতুন ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে ক্রেতাদের একটি অংশ ফোনের ব্যবহারকাল বাড়িয়ে নতুন ডিভাইস কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করে উন্নত সুবিধার ফোন কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন।

ফলে বাজারে কম দামের নতুন স্মার্টফোনের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যবহৃত ও সংস্কার করা ফোনের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

বছরের বাকি সময়েও সংকটের আশঙ্কা

চলতি বছরের বাকি সময়েও স্মার্টফোন বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকদের মতে, নির্মাতারা উৎপাদন কমানো, স্মার্টফোনের মডেলের সংখ্যা সীমিত করা এবং বেশি দামের ফোনের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত রাখতে পারেন।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন কম বাজেটের ক্রেতারা। মেমোরি চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের সরবরাহ সীমিত থাকা এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে স্মার্টফোনের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফোনের দাম বাড়লে নতুন ডিভাইস কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন অনেক ক্রেতা। এতে বাজারে চাহিদা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে কম দামের ফোনের বিকল্প সীমিত হয়ে গেলে প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন ডিভাইস কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার স্মার্টফোন শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও মেমোরি চিপের সরবরাহ ও দামের ওপর বাড়তি চাপ এই শিল্পকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আগামী মাসগুলোতে চিপের সরবরাহ পরিস্থিতি এবং নির্মাতাদের মূল্য ও উৎপাদন কৌশলই বিশ্ব স্মার্টফোন বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন