লাদাখের ২৮ এলাকা নিয়ে চীনের নতুন মানচিত্র, কড়া প্রতিবাদ ভারতের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১২ অপরাহ্ণ
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী অন্তত ২৮টি অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের দাবি, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ দেশটির অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। চীন মানতে না চাইলেও এ বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হবে না।

চীনের নতুন মানচিত্র এবং লাদাখের ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থান সীমান্ত পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের সামরিক সংঘর্ষের স্মৃতি এবং দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে চলমান বিরোধের মধ্যে মানচিত্র প্রকাশের এই ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং লাদাখের মর্যাদা নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং নিজস্ব সীমানা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার চীনের নেই।

চীনের দাবি, বিতর্কিত অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে তাদের ভূখণ্ড

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত একতরফাভাবে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। বেইজিং এ সিদ্ধান্ত কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, চীন-ভারত সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিতর্কিত এলাকাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই চীনের ভূখণ্ডের অংশ।

চীনের এই অবস্থানের ভিত্তিতে মাও নিং দাবি করেন, এসব এলাকায় ভারতের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই বৈধ বা কার্যকর বলে গণ্য হবে না। নতুন মানচিত্রের মাধ্যমে চীন তার ভূখণ্ডগত দাবির অবস্থান আবারও তুলে ধরেছে বলে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

তবে সীমান্তের এসব এলাকার মালিকানা নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। উভয় দেশই বিভিন্ন অংশে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে আসছে। ফলে নতুন মানচিত্র প্রকাশের বিষয়টি কেবল ভৌগোলিক চিত্র উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের সার্বভৌমত্বের দাবি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।

ভারতের পাল্টা বক্তব্য, লাদাখ অবিচ্ছেদ্য অংশ

চীনের বক্তব্যের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানায়। নয়াদিল্লির বিবৃতিতে বলা হয়, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। চীন যতবারই এই বাস্তবতা অস্বীকার করুক না কেন, তাতে ভারতের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।

ভারতের বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সীমানা নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার বেইজিংয়ের নেই। নয়াদিল্লির মতে, চীনের নতুন মানচিত্রে কোনো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হলেও তাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকৃত বা আইনগত মর্যাদা পরিবর্তিত হয় না।

ভারতের এই প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, লাদাখের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রশ্নে দেশটি কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে চীনও অঞ্চলটির মর্যাদা এবং সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে বিরোধের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিতর্কিত এলাকার তালিকায় গোগরা ও হট স্প্রিং

চীনের নতুন মানচিত্র ঘিরে আলোচনায় এসেছে ভারতের পূর্ব লাদাখের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর তালিকায় রয়েছে গোগরা ও হট স্প্রিং। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনার সময় এই এলাকাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

এ ছাড়া আলিশা গিরি, কারুন পীর ও জোরাওয়ার পিকের মতো কৌশলগত পাহাড়, গিরিপথ ও হিমবাহের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চতা এবং সীমান্তের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে এসব স্থানের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

হিমালয় অঞ্চলের সীমান্তে পাহাড়, গিরিপথ ও উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ সামরিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব এলাকা থেকে সেনা চলাচল, নজরদারি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে মানচিত্রে অঞ্চলগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ কেবল প্রতীকী নয়; এর সঙ্গে সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত স্বার্থের বিষয়ও জড়িত।

তবে মানচিত্রে কোনো অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সেই এলাকার ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সীমান্তবিরোধের ক্ষেত্রে ভূখণ্ডগত দাবি, ঐতিহাসিক দলিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ভারত ও চীনের বিরোধের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট

ভারত-চীন সীমান্তবিরোধের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ। ওই বছরের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ১৯৭৫ সালের পর সেটিই ছিল দুই দেশের সীমান্তে প্রথম প্রাণঘাতী সামরিক সংঘর্ষ।

ওই ঘটনায় ভারতের অন্তত ২০ জন সেনা নিহত হন। চীনের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন অস্পষ্টতা ছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমে চীনের চার সেনা নিহত হওয়ার দাবি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে চীনও তাদের সেনাদের হতাহতের কথা স্বীকার করে, যদিও দুই পক্ষের প্রকাশিত তথ্য ও বিবরণে পার্থক্য রয়েছে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। সীমান্তে সেনা মোতায়েন, সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা ও সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গালওয়ানের ঘটনা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। এরপর সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং সংঘর্ষ এড়ানো দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। তবে ওই ঘটনার পরও সীমান্তসংক্রান্ত সব বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগের পরও নিয়ন্ত্রণরেখায় অনিশ্চয়তা

২০২০ সালের সংঘর্ষের পর ভারত ও চীন সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় সেনা প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। কিছু এলাকায় সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো সীমান্তবিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের (এলএসি) অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বলে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে সীমান্তের বিভিন্ন অংশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং নিয়ন্ত্রণরেখার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন ও নজরদারি দুই দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন হলেও ভূখণ্ডগত দাবির বিরোধ সমাধান করা কঠিন হয়ে রয়েছে। নতুন মানচিত্র প্রকাশের ঘটনা সেই পুরোনো বিরোধকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে গোগরা ও হট স্প্রিংয়ের মতো এলাকা আলোচনায় আসায় ২০২০ সালের সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

মানচিত্র প্রকাশের কূটনৈতিক তাৎপর্য

কোনো দেশের সরকারি মানচিত্রে বিতর্কিত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা তার ভূখণ্ডগত দাবির প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ একাই আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা নির্ধারণ করে না। ভারত ও চীনের ক্ষেত্রেও নতুন মানচিত্রের বিষয়টি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি নতুন প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীন তার ঐতিহাসিক দাবির কথা তুলে ধরছে, আর ভারত লাদাখকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করে সেই দাবির বিরোধিতা করছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি স্পষ্ট হলেও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পারস্পরিক আলোচনা ও গ্রহণযোগ্য সীমান্ত সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।

দুই দেশই এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে পড়তে পারে। সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু সামরিক সম্পর্ক নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ভারত-চীন সীমান্তবিরোধ কোন দিকে এগোবে

লাদাখের ২৮টি অঞ্চল নিয়ে চীনের নতুন মানচিত্র প্রকাশ এবং ভারতের প্রতিবাদ দুই দেশের সীমান্তবিরোধকে আবারও সামনে এনেছে। চীন তার ভূখণ্ডগত দাবিতে অনড় অবস্থান তুলে ধরেছে, আর ভারত জানিয়েছে, লাদাখের মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের অস্বীকৃতি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই কূটনৈতিক বিরোধ সীমান্তে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে এবং দুই দেশ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী পদক্ষেপ নেয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে সামরিক পর্যায়ের যোগাযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নতুন মানচিত্র প্রকাশের পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে কী অগ্রগতি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সীমান্তের বিতর্কিত এলাকাগুলোর বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারত ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে লাদাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

কালের আলো/এসএ

 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন