গ্রাম ও শহরের প্রতিটি শিশুর জন্য শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। কোনো শিশু যেন টিকাদান কর্মসূচির বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা নেওয়ার উপযোগী শিশুদের শনাক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের মধ্যে টিকাদানের বৈষম্য দূর করা এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের টিকার আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন মন্ত্রী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশে ইপিআই ও ভিপিডি সার্ভেইলেন্সের যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা ২০২৬-এর ফলাফল অবহিতকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনার নির্দেশ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা শতভাগে উন্নীত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতিটি বাড়ি ও মহল্লায় গিয়ে টিকা নেওয়ার উপযোগী শিশুদের চিহ্নিত করতে হবে।
তিনি বলেন, গ্রাম ও শহরের মধ্যে টিকাদানের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করা জরুরি। দেশের কোনো এলাকার শিশুই যেন টিকা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে যেসব শিশু টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসছে না, তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নির্দেশনা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
টিকার গুণগত মান ও সংরক্ষণে নজরদারির তাগিদ
শুধু টিকার আওতা বাড়ানোই নয়, টিকার গুণগত মান বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোল্ড চেইন ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
টিকা সরবরাহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও প্রয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা যাতে না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজর দিতে হবে।
পাশাপাশি টিকার কার্যকারিতা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়মিত যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি টিকার মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
১৯৭৯ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইপিআই
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংক্রামক রোগ ও মহামারির ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে টিকাদান কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শিশুদের বিভিন্ন মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
দেশে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ ক্ষেত্রে গ্যাভি, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হলে মাঠপর্যায়ে কর্মীদের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসূচির বাস্তবায়ন, টিকার মান এবং শিশুদের টিকা পাওয়ার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটের পরিকল্পনা
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে নগরবাসী—সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করছে।
এই সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে পৃথক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আরও এক লাখ ‘কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং কর্মী’ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী।
তিনি আরও বলেন, টিকাদান কর্মসূচি ও রোগ নজরদারির ফলাফল মূল্যায়ন দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে কর্মসূচির অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কর্মশালায় স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ ডা. রাজেশ নরওয়েল, ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপসহ স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এবং ভ্যাকসিন-প্রতিরোধযোগ্য রোগের (ভিপিডি) নজরদারির যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা ২০২৬-এর ফলাফল তুলে ধরা হয়। টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি মূল্যায়ন, রোগ নজরদারি জোরদার এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে এ পর্যালোচনার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৩৮ অপরাহ্ণ