সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত অ্যানথ্রপিকের এক প্রতিবেদনে এ সম্ভাব্য ঝুঁকির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটির উদ্বেগের সঙ্গে একমত হলেও অন্যদের কেউ কেউ এ ধরনের পরিস্থিতি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভাব্য কোনো পরিস্থিতি আর বাস্তবে ঘটতে যাওয়া ঘটনা এক নয়।
কীভাবে নিজের অনুলিপি তৈরি করে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই?
অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কিছু এআই মডেল নিজেদের অনুলিপি তৈরি, নতুন ডিভাইসে প্রবেশ এবং প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা সংগ্রহের মতো কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হতে পারে। এসব সক্ষমতা একত্র হলে কোনো নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের পক্ষে একাধিক ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বটনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বটনেট হলো ইন্টারনেটে যুক্ত একাধিক কম্পিউটার, সার্ভার বা অন্যান্য ডিভাইসের নেটওয়ার্ক, যেগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাইবার অপরাধীরা সাধারণত এসব ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, কোনো এআই যদি নিজেই এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সেটিকে শনাক্ত করা ও নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে, যদি এআইটি কোনো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ডিভাইসে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বন্ধ করে পুরো নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব নাও হতে পারে।
মাঝারি আকারের এআই মডেল নিয়েও উদ্বেগ
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষায় ৩০ বিলিয়ন বা তার কম প্যারামিটারবিশিষ্ট মাঝারি আকারের এআই মডেলগুলো নিজেদের অনুলিপি তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি পৃথক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পেরেছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মডেলগুলোর এখনো সমস্যা রয়েছে।
প্যারামিটার হলো এআই মডেলের ভেতরে শেখা সংখ্যাগত মান, যেগুলোর মাধ্যমে মডেল ইনপুট বিশ্লেষণ করে ফলাফল তৈরি করে। সাধারণভাবে প্যারামিটারের সংখ্যা মডেলের আকার ও জটিলতার একটি ধারণা দেয়, যদিও শুধু এই সংখ্যা দিয়ে কোনো মডেলের সামগ্রিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না।
অ্যানথ্রপিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট-সংযুক্ত তুলনামূলক কম খরচের বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেগুলোর কম্পিউটিং ক্ষমতা একত্র করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে। এমনটি সম্ভব হলে কোনো একক শক্তিশালী কম্পিউটারের ওপর নির্ভর না করেও একটি এআই ব্যবস্থা বিভিন্ন ডিভাইসের সম্মিলিত সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে।
তবে পরীক্ষায় পৃথক কিছু কাজ করতে পারা মানেই বাস্তব ইন্টারনেটে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারা নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটাতে আরও অনেক প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বাধা অতিক্রম করতে হবে।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সক্ষমতা বাড়ার পূর্বাভাস
অ্যানথ্রপিকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ছোট আকারের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা যদি আগের গতিতেই বাড়তে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
প্রতিবেদনে সম্ভাব্য আরেকটি ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। সেটি হলো, নিজেদের বিস্তার ঘটাতে এআই মডেলগুলো আরও শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামোর দিকে নজর দিতে পারে। এর মধ্যে ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত প্রসেসর ও অন্যান্য কম্পিউটিং সম্পদ থাকতে পারে। এসব অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এআইয়ের হাতে আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এ পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে তৈরি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটবেই, এমন নিশ্চয়তা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তার বাস্তবতা ও উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিন মনে করেন, ছোট আকারের এআই মডেলকে কম খরচের কোনো ডিভাইসে চালাতে পারা নিজে থেকেই বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের প্রমাণ নয়। তাঁর মতে, অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদন প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এতে নিজেদের প্রযুক্তি বা পণ্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের এই সংশয়ের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে। বড় এআই মডেলগুলো সাধারণত আকারে বিশাল এবং সেগুলো চালাতে উল্লেখযোগ্য কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। ফলে একটি ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে মডেল সরিয়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সংগ্রহ করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়।
এ কারণে কোনো এআই মডেল কিছু নির্দিষ্ট কাজ করতে পারলেও সেটি বাস্তবে একটি বিস্তৃত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বটনেট গড়ে তুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এআই ‘ওয়ার্মে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো ডেনভারের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঝেংশিয়ং লি বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হলেও এ ধরনের পরীক্ষা সম্ভাব্য বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আশঙ্কা করছেন, এআই কোনো একক কেন্দ্রীয় সেবার ওপর নির্ভর না করে অসংখ্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারলে সেটি কম্পিউটার ওয়ার্মের মতো আচরণ করতে পারে।
ওয়ার্ম হলো এক ধরনের ক্ষতিকর কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নিজে থেকেই নিজের অনুলিপি তৈরি করে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণ ভাইরাসের মতো সব সময় অন্য কোনো ফাইলের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রয়োজন হয় না বলে ওয়ার্ম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
লি মনে করেন, এমন কোনো এআই যদি বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নতুন উপায় খুঁজে বের করতে পারে এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ চালিয়ে যায়, তাহলে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এ আশঙ্কাও এখনো সম্ভাব্য ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে; বাস্তবে এমন একটি এআই নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে বলে এখানে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
নিয়ন্ত্রণহীন এআই নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ
এআইয়ের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদন বৃহত্তর একটি নিরাপত্তা বিতর্কের অংশ। এআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় সাইবার হামলা চালানো, মানুষের সীমিত তদারকিতে জটিল কাজ সম্পন্ন করা এবং বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার বাধা এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ বাড়ছে।
এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই এসব ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের কিছু কর্মকর্তা ও গবেষক নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন।
তবে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বর্তমান সক্ষমতা, পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো কাজ পরীক্ষামূলকভাবে করা সম্ভব হওয়া আর বাস্তব পরিবেশে বড় পরিসরে তা সফলভাবে সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়।
ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজির জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জেসিকা জি মনে করেন, গত তিন মাসে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআইয়ের কার্যকলাপ নিয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে, সেগুলোর আলোকে মডেলগুলোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত।
তবে এ ধরনের পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা কতটা, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়, কিন্তু এটি যে ঘটবেই, তারও নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদন এআইয়ের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগেভাগে শনাক্ত করা, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং এআইয়ের উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল তৈরি করা। তবে নিয়ন্ত্রণহীন এআই ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:০৫ অপরাহ্ণ