. টানা ৩০ দিন প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে কী পরিবর্তন আসে?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:০৯ অপরাহ্ণ
প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ ডিম দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার পরিচিত একটি খাবার। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর বা রাতের খাবার—বিভিন্নভাবে ডিম খাওয়া যায়। পেশির গঠন, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু টানা ৩০ দিন প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

একসময় ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই নিয়মিত ডিম খাওয়া এড়িয়ে চলতেন। তবে পুষ্টিবিজ্ঞানের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে ডিম রাখা যেতে পারে। এর উপকারিতা নির্ভর করে ডিম কতটা খাওয়া হচ্ছে, কীভাবে রান্না করা হচ্ছে এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন কেমন—এসব বিষয়ের ওপর। নিয়মিত ডিম খেলে সম্ভাব্য পাঁচটি উপকার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১. পেশি গঠন ও মেরামতে সাহায্য করে

ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের ভালো উৎস। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে, যা পেশি গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত পেশি মেরামত এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা পেশির শক্তি বাড়াতে চান, তাঁদের খাদ্যতালিকায় ডিম উপকারী হতে পারে। ব্যায়ামের পর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে পেশির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে সহায়তা পাওয়া যায়। তবে শুধু ডিম খেলেই পেশি বাড়বে, এমন নয়। এর জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্যও প্রয়োজন।

২. হৃদ্‌স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে

ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এটি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় ছিল। তবে খাদ্য থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলের প্রভাব সবার শরীরে এক রকম নয়। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত ডিম খাওয়া সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

ডিমে থাকা প্রোটিন, কোলাইন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তবে ডিম খেলে সবার ভালো কোলেস্টেরল বাড়বে কিংবা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমবে—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে এবং খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কত—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

যাঁদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্‌রোগ রয়েছে বা চিকিৎসক বিশেষ খাদ্যনিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত ডিম খাওয়ার পরিমাণ সম্পর্কে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৩. মস্তিষ্ক ও চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে

ডিমে রয়েছে কোলাইন, যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। এটি অ্যাসিটাইলকোলিন নামের নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই রাসায়নিক উপাদান স্মৃতিশক্তি, শেখা এবং পেশির কার্যক্রমসহ শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

এ ছাড়া ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জেক্সানথিন নামের দুটি ক্যারোটিনয়েড রয়েছে। এগুলো চোখের রেটিনায় উপস্থিত থাকে এবং চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে দৃষ্টিশক্তির কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে; সুষম খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ চোখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক।

তবে নিয়মিত ডিম খেলেই স্মৃতিশক্তি অসাধারণ হয়ে উঠবে কিংবা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা প্রতিরোধ করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মস্তিষ্ক ও চোখ ভালো রাখতে সামগ্রিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

ওজন কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ডিম একটি কার্যকর খাদ্যবিকল্প হতে পারে। এতে থাকা প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ফলে খাবারের মাঝখানে অতিরিক্ত নাশতা খাওয়ার প্রবণতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কমতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের নাশতায় ডিম খেলে অন্য কিছু নাশতার তুলনায় তৃপ্তি বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। তবে ওজন কমার বিষয়টি নির্ভর করে সারা দিনে মোট কত ক্যালোরি গ্রহণ করা হচ্ছে এবং শরীর কতটা শক্তি ব্যয় করছে, তার ওপর।

ডিম ভেজে খাওয়ার সময় অতিরিক্ত তেল, মাখন বা বেশি ক্যালোরিযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করলে খাবারের মোট ক্যালোরি বেড়ে যেতে পারে। তাই সেদ্ধ ডিম বা অল্প তেলে রান্না করা ডিম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে।

৫. ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্যে সহায়তা করে

ডিমে থাকা প্রোটিন শরীরের কোষ ও টিস্যু গঠন এবং মেরামতে প্রয়োজনীয়। চুল ও নখের গঠনেও প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ডিমে বায়োটিন, ভিটামিন ডি এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অবদান রাখে।

শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে চুল ও নখের স্বাস্থ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণে সুষম খাদ্য সহায়ক হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণের পরও চুল পড়া বা ত্বকের সমস্যা থাকলে তার পেছনে হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত বৈশিষ্ট্য কিংবা অন্য শারীরিক কারণ থাকতে পারে।

তাই প্রতিদিন ডিম খেলেই ত্বক উজ্জ্বল হবে বা চুল পড়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। এসব ক্ষেত্রে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও সমস্যার প্রকৃত কারণ বিবেচনা করা জরুরি।

প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত?

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ডিমের উপযুক্ত পরিমাণ নির্ধারণে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক কার্যক্রম, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনেক সুস্থ মানুষ সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে প্রতিদিন একটি ডিম খেতে পারেন। তবে সবার জন্য প্রতিদিন এক বা দুটি ডিম একইভাবে উপযুক্ত—এমন সর্বজনীন নিয়ম নেই।

ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত। পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন। শুধু ডিমের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়াই স্বাস্থ্যকর পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, টানা ৩০ দিন পরিমিত পরিমাণে ডিম খেলে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পেতে পারে। তবে এর ফলাফল সবার ক্ষেত্রে এক হবে না। পেশি গঠন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, মস্তিষ্ক ও চোখের স্বাস্থ্য এবং ত্বক-চুলের যত্নে ডিম সহায়ক হলেও এর উপকার পেতে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা জরুরি।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন