ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাটখড়ি সংগ্রহ, শুকানো ও বিক্রিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। পাট কাটার পর কৃষকেরা এখন পাটখড়ি যত্ন করে তুলে রাখছেন। কেউ বাড়ির উঠানে, কেউ রাস্তার পাশে, আবার কেউ খোলা জায়গায় স্তূপ করে রোদে শুকাচ্ছেন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা সেসব পাটখড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ফেলনা পণ্য থেকে বাড়তি আয়ের উৎস
সালথা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর পাশাপাশি পাটখড়ি সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষকেরা। আগে যে পাটখড়ি অনেক সময় অবহেলায় পড়ে থাকত, এখন সেটিই বিক্রির উপযোগী করে তুলতে রোদে শুকানো হচ্ছে। ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে পরে তা বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পাট চাষে বীজ, সার, শ্রমিক ও জমি প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। পাটের আঁশ বিক্রি থেকে মূল আয় আসে। এর সঙ্গে পাটখড়ি বিক্রির অর্থ যুক্ত হওয়ায় মোট আয় কিছুটা বাড়ছে। ফলে পাটখড়ি আর শুধু কৃষিকাজের উপজাত নয়, বরং কৃষকের কাছে বাড়তি মূল্য পাওয়ার একটি সুযোগ হয়ে উঠেছে।
পাটখড়ি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা
সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড়গ্রাম এলাকার কৃষক শাহাজুদ্দিন মাতুব্বর বলেন, আগে পাটের আঁশ বিক্রি করাই ছিল প্রধান বিষয়। পাটখড়ি অনেক সময় পড়ে থাকত। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকেই পাটখড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পাট চাষ থেকে বাড়তি লাভ হচ্ছে।
আরেক কৃষক আজাদ শেখ বলেন, পাটখড়ি শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে পরে বিক্রি করা যায়। এতে বাড়তি কিছু টাকা পাওয়া যায়, যা পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজনে কাজে লাগে।
কৃষকদের মতে, পাটখড়ি বিক্রির সুযোগ বাড়ায় এখন এটি ফেলে রাখার বদলে যত্ন করে সংরক্ষণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে দাম তুলনামূলক কম থাকলেও পরে চাহিদা বাড়লে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রতি পাটখড়ি ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সালথায় প্রতি মোটা পাটখড়ি ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ১০০ মোটা পাটখড়ির দাম ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ টাকা। বাজারে চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।
তবে পাটখড়ির দাম ও বিক্রির পরিমাণ নির্ভর করে এর মান, শুকানোর অবস্থা এবং বাজারের চাহিদার ওপর। তাই সঠিকভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান।
চাহিদা থাকায় সক্রিয় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা
স্থানীয় পাটখড়ি ব্যবসায়ী বাদল হোসেন বলেন, এ বছর পাটখড়ির চাহিদা ভালো। কৃষকদের কাছ থেকে পাটখড়ি সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন তাঁরা। চাহিদা থাকায় পাটখড়ি এখন আর ফেলনা পণ্য নয়।
ব্যবসায়ীদের এই তৎপরতায় কৃষকের বাড়ি থেকেই পাটখড়ি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষকদের আলাদাভাবে পরিবহন করে বাজারে নেওয়ার প্রয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে। একই সঙ্গে সংগ্রহ, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্যও আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাট চাষ আরও লাভজনক হতে পারে। পাটখড়ির বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা সম্ভব।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসানুল হাবীব আল আজাদ বাংলানিউজকে বলেন, পাট বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়ির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষকেরা বাড়তি আয় করতে পারবেন। কৃষকদের পাটখড়ি সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, পাটের উপজাত হিসেবে পাটখড়ির অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে পাট চাষে কৃষকের লাভের পরিমাণও বাড়তে পারে।
পাটখড়িকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, পাটখড়িকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হওয়া প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জক। একসময় ফেলে দেওয়া পাটখড়ি এখন কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাটচাষিদের সার্বিক সুবিধা-অসুবিধা তদারকি করা হচ্ছে। পাট ও পাটখড়ির সঠিক সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, যাতে কৃষকেরা তাঁদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পান।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পাটখড়ির সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। এতে পাটের আঁশের ওপর নির্ভরশীল আয়ের বাইরে কৃষকের হাতে অর্থ আসবে, পাশাপাশি গড়ে উঠতে পারে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।
একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা পাটখড়ির এই পরিবর্তন কৃষিপণ্যের প্রতিটি অংশকে কাজে লাগানোর গুরুত্বও তুলে ধরছে। পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা ও বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে সালথার পাটচাষিদের জন্য পাটখড়ি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এসএ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:৫৩ অপরাহ্ণ