যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বড় সম্ভাবনা দেখছেন বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, দেশটির মোট আমদানির বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব মাত্র শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যাবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, খাদ্য ও হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিপণ্য, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল এবং প্লাস্টিকসহ সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, পণ্যের সনদায়ন প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের উন্নয়ন এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার ঢাকা চেম্বার অডিটোরিয়ামে ‘যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি: তৈরি পোশাক ব্যতীত অন্যান্য খাতের সম্ভাবনা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলা হয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশন যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে।
১০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যে বহুমুখীকরণ
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৯৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়লেও পণ্যভিত্তিক বৈচিত্র্য এখনো সীমিত।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য বছরে প্রায় ৯৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। বিপুল এই বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব মাত্র শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ। বক্তাদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি অংশীদারত্ব ১ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে দেশটিতে রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু তৈরি পোশাকের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং যুক্তরাজ্যের ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য তৈরি, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং বিভিন্ন খাতের রপ্তানিযোগ্য সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পোশাকের বাইরে যেসব খাতে সম্ভাবনা
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তিনি যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, খাদ্য ও হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিজাত পণ্য, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল এবং প্লাস্টিক খাতের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের এসব খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো গেলে যুক্তরাজ্যের বাজারে নতুন ক্রেতা তৈরি এবং পণ্যের পরিসর সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মকানুন মেনে চলার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) রপ্তানিমুখী উৎপাদনে যুক্ত করতে অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বক্তারা।
আন্তর্জাতিক মান ও সনদায়নে ঘাটতি দূর করার তাগিদ
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগ তৈরি পোশাকনির্ভর। অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গুণগত মান, সনদায়ন, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ অনুসরণযোগ্য করা, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং কমপ্লায়েন্স পরিপালনে আরও উন্নতি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই চলে না; ক্রেতাদের নির্ধারিত মান, নিরাপত্তা, পরিবেশগত শর্ত এবং শ্রমসংক্রান্ত বিধিবিধানও মেনে চলতে হয়। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে নতুন বাজারে প্রবেশ কিংবা বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও টেস্টিং সুবিধা বাড়ানো, পণ্যের সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এলডিসি উত্তরণের পরও বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন শর্তের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান বলেন, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পরও যুক্তরাজ্যের বাজারে অব্যাহত সুবিধা ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে নিশ্চয়তা দেবে।
কর্মশালায় ব্রিটিশ সরকারের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস)-এর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এ স্কিমের আওতায় প্রযোজ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা কীভাবে গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের বাণিজ্য উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা এলি পার্কার কর্মশালায় ডিসিটিএস নিয়ে একটি কারিগরি অধিবেশন পরিচালনা করেন। এতে এলডিসি উত্তরণের পরও প্রযোজ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা গ্রহণের ব্যবহারিক নির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার ওপর জোর
যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুল্কসংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি অশুল্ক বাধাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পণ্যের মান যাচাই, সনদায়ন, আমদানি বিধিবিধান এবং বাজারের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে গিয়ে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা নিরসনের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বাজারসংক্রান্ত নীতি সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের গভীর ধারণা অর্জন এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
কর্মশালার আলোচনায় কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট-চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম, হরটেক্স ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশিদ আহমদ ফারহাদ, মেঘনা গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাক আহমেদ তানভীর, কাপকেক এক্সপোর্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির ওবায়েদ, এম ইউ সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস এবং বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর বক্তব্য দেন।
রপ্তানি বহুমুখীকরণই বড় চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা থাকলেও লক্ষ্য অর্জনে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উৎপাদনব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন খাতে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণ জরুরি।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:৩২ অপরাহ্ণ