জনবল সংকটে ধুঁকছে ছাতক বিদ্যুৎ বিভাগ, ভোগান্তিতে ৪৫ হাজার গ্রাহক

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:৪৫ অপরাহ্ণ

জরুরি বিদ্যুৎ মেরামতের জন্য নেই পর্যাপ্ত লাইনম্যান, শূন্য ফোরম্যান ও ইলেকট্রিশিয়ানের পদ। মিটার পাঠক, স্টোর কিপার ও অভিযোগ গ্রহণকারীর পদেও নেই জনবল। জরুরি কাজে ব্যবহারের জন্য তিনটি গাড়ি থাকলেও নেই স্থায়ী চালক। অনুমোদিত ৯০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। এমন জনবল সংকট নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সুনামগঞ্জের ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যক্রম।

এ পরিস্থিতিতে ছাতক উপজেলার পাশাপাশি দোয়ারাবাজার ও জগন্নাথপুর উপজেলার আংশিক এলাকার বিদ্যুৎসেবা পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে বিভাগের আওতাধীন প্রায় ৪৫ হাজার ৩০০ গ্রাহক কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ঝড়-বৃষ্টির সময় এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৪ জন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পদে অনুমোদিত জনবল ৯০ জন। কিন্তু স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত জনবলের বড় একটি অংশই নেই। গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও প্রশাসনিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় তৈরি হয়েছে সংকট।

কার্যালয়ে সহকারী প্রকৌশলীর পদ শূন্য। উপসহকারী প্রকৌশলীর চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। উচ্চমান সহকারী ও হিসাব সহকারীর পদও শূন্য রয়েছে। নিম্নমান সহকারীর চারটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন একজন। নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিকের দুটি পদের একটি শূন্য।

এ ছাড়া চারটি মিটার পাঠকের পদে কেউ নেই। স্টোর কিপার ও অভিযোগ গ্রহণকারীর পদেও জনবল নেই। সাবস্টেশন-সংশ্লিষ্ট এসবিএর ১৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। ফলে কারিগরি কাজের পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

লাইনম্যান ও ফোরম্যানের সংকটে ব্যাহত মেরামতকাজ

বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের জন্য লাইনম্যান ও ফোরম্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ছাতক বিদ্যুৎ বিভাগে এই জনবলই সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফোরম্যান ও তিন শ্রেণির লাইনম্যানের মোট ছয়টি পদ শূন্য। ইলেকট্রিশিয়ানের সব পদও খালি। বিদ্যুৎ লাইনের কাজে সহায়তাকারী ১৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় নিয়মিত সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিভাগটিকে।

কার্যালয়ে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহারের জন্য তিনটি গাড়ি থাকলেও সেগুলো চালানোর স্থায়ী চালক নেই। পাশাপাশি এমএলএসএস কাম গার্ডের ছয়টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। নিরাপত্তা প্রহরীর ১৩টি পদের মধ্যে চারটি শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এমএলএস পদেও জনবল সংকট রয়েছে।

অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

জনবল সংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে অদক্ষ ও অস্থায়ী দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের দিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের কাজ করানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক কাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লাইনম্যানের অভাবে গ্রাহকদের সেবা দিতে অস্থায়ী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনে কাজের জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা না গেলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থেকে যায়।

বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ লাইন, ঝড়-বৃষ্টিতে বাড়ে দুর্ভোগ

ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিসর। খাল-বিল ও হাওরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ লাইন বিস্তৃত থাকায় বিভিন্ন স্থানে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত সেখানে পৌঁছে মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঝড়-তুফানের সময় বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা দেখা দিলে জনবল সংকটের কারণে তা মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

বিভাগটির আওতায় ছাতক ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে ছাতক উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ছাতক ১৩২/৩৩ কেভি উপকেন্দ্র থেকে ১৩২ কেভি সার্কিটের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

এ এলাকায় লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কারখানা, ছাতক সিমেন্ট কারখানা, সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলসহ বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও সরকারি দপ্তর রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা এবং ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামত করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বছরের পর বছর শূন্য পদ, চিঠি দিয়েও মিলছে না সমাধান

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জনবল সংকট নিরসনে শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। জরুরি মেরামত, বিদ্যুৎ লাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে দ্রুত জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত জনবল না পাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকসেবায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা, মেরামতকাজ পরিচালনা এবং গ্রাহকদের অভিযোগের নিষ্পত্তি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে সীমিতসংখ্যক কর্মীকে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান

ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ তারেক বলেন, জনবল স্বল্পতার কারণে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সিলেট অঞ্চলের বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, জনবল সংকটের বিষয়টি তাঁদের জানা রয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যুতের প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগের বড় একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে জনবল সংকট অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন