পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে জলবিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরশক্তি থেকেও উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা পাহাড়ি জমিতে স্থাপিত কর্ণফুলী সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। গত প্রায় সাত বছরে কেন্দ্রটি থেকে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, যার বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগ দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পরিত্যক্ত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
কাপ্তাই বাঁধের পাশে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রায় ২২ একর পরিত্যক্ত জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। সেই জমির মধ্যে ১৯ একর জায়গায় ২০১৯ সালে স্থাপন করা হয় কর্ণফুলী সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা ৭ মেগাওয়াট। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১১১ কোটি টাকা।
কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে আগে অব্যবহৃত থাকা জমি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
সাত বছরে উৎপাদন ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট
কেন্দ্রটি থেকে গত প্রায় সাত বছরে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। এর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্যতম সুবিধা হলো পরিচালনায় তুলনামূলক কম জনবল প্রয়োজন হয়। সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই এর প্রধান কাজ। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
কম পরিচালন ব্যয়ে উৎপাদনের সম্ভাবনা
কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বেশ লাভজনক। এটি পরিচালনায় জনবল ও ব্যয় তুলনামূলক কম। নিয়মিত সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখাই মূল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ।
তিনি জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পর সৌরশক্তিতে নতুন সংযোজন
কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ৫৭ বছর পর ৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ প্রকল্প সৌরশক্তির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের নতুন উৎস তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। এতে অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগও বাড়ছে।
উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে দুটি উদ্যোগ
কাপ্তাইয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দুটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা আরও ১ মেগাওয়াট বাড়ানোর কাজ চলছে। এতে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।
পাশাপাশি কাপ্তাই উপজেলার ইটভাটা এলাকায় ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে সৌরশক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়বে।
পাহাড়ি অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে উপযোগী ও অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে যে জমি দীর্ঘদিন কোনো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে জমির উপযোগিতা, আবহাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৩১ অপরাহ্ণ