সাজেকে ‘ফুল বুকিং’ রিসোর্ট এখন সুনশান, ১৫ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৪৩ অপরাহ্ণ

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠার কথা ছিল রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। আগাম বুকিংয়ে পূর্ণ ছিল কটেজ ও রিসোর্টের প্রায় সব কক্ষ। পরিবহণের ব্যবস্থাও করেছিলেন পর্যটকেরা। কিন্তু আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় পাল্টে গেছে পুরো চিত্র। পর্যটকদের আনাগোনার বদলে রিসোর্ট-কটেজে নেমেছে নীরবতা। এতে দুর্গাপূজার মৌসুমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৪ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটকের ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল। সাজেক বন্ধের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে পর্যটন খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

আগাম বুকিং শেষ, তবু পর্যটক নেই

সাজেক কটেজ-রিসোর্ট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেববর্মন জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটি থাকায় ১৪ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজগুলোর সব কক্ষ আগাম বুকিং দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থাও আগেই করা হয়েছিল।

কিন্তু পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় এসব বুকিং ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যবসায়িক প্রত্যাশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। রিসোর্ট-কটেজের মালিকদের পাশাপাশি পরিবহণসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্য ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন।

সুপর্ণ দেববর্মনের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। দুর্গাপূজার মতো ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে এমন পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দিয়েছে।

কেন বন্ধ হলো সাজেক পর্যটনকেন্দ্র

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের জেরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত রোববার, ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ ঘোষণা দেন।

গণবিজ্ঞপ্তিতে ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্দেশিত সময়ের এক দিন আগেই, ১২ অক্টোবর সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করেন।

প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের পেছনে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা এবং সড়কে অবরোধের কারণে পর্যটকদের স্বাভাবিক যাতায়াতও ব্যাহত হয়।

আঞ্চলিক সংঘাত ও সড়ক অবরোধে ভোগান্তি

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাস ধরে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এবং প্রসীত খীসার সমর্থিত ইউপিডিএফের অস্ত্রধারীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে।

এ পরিস্থিতিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠন ওই এলাকা থেকে জেএসএসের অস্ত্রধারীদের বিতাড়নের দাবিতে গত রোববার ভোর ৬টা থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকেরা।

পরে ওই দিন বিকেল ৩টা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার পর দুই দিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এরপর সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

‘প্রতি বছর বুকিং থাকে, সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হই’

ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য উজ্জ্বল দেব বলেন, দুর্গাপূজার মৌসুমে গত দুই থেকে তিন বছর ধরে তাঁদের কটেজ ও রিসোর্টের সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে যায়। কিন্তু এ সময় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।

তিনি পর্যটন ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।

ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটন মৌসুমে আগাম বুকিংয়ের ওপর নির্ভর করে রিসোর্ট ও কটেজ পরিচালনার বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পর্যটকেরা না এলে কক্ষ ভাড়া থেকে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহণ, খাবার, স্থানীয় দোকানপাট এবং অন্যান্য সেবার ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু রিসোর্ট মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।

নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ, কঠোর অভিযানের ঘোষণা

সোমবার খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক বলেন, অবৈধ অস্ত্রধারীদের অপতৎপরতায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এসব অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক করার দাবি জানাচ্ছেন।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন

সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

বুধবার সকালে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। দাবি পূরণ না হলে খাগড়াছড়িতে টানা হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণাও আসে। পরে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দুই আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের জেরে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। তাঁদের দাবি, দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে রিসোর্ট-কটেজে আগাম বুকিং থাকা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা যেতে না পারলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে।

পর্যটন ও নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয়ের দাবি

সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ভ্রমণের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ ছুটির মৌসুমে পর্যটক আসতে না পারলে রিসোর্ট-কটেজের পাশাপাশি পরিবহণ, খাবার ও অন্যান্য স্থানীয় ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পর্যটনকেন্দ্র চালু করা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাই পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উদ্যোগের ওপরই নির্ভর করছে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন