বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার পর দেওয়া ওই পোস্টে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের একটি ভিডিও ফুটেজ যুক্ত করেন ধ্রুব। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে তিনি অঙ্কিতা ভাণ্ডারির মা–বাবার প্রসঙ্গ তুলে ধরে অভিযোগ করেন, যে ব্যবস্থার মধ্যে তাঁদের মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই এখন তাঁর মা–বাবাকেও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না।
ধ্রুব রাঠির এই মন্তব্য ঘিরে অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডের বিচার, কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
মেয়ের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে আটক মা–বাবা
ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের ১৯ বছর বয়সী তরুণী অঙ্কিতা ভাণ্ডারি একটি রিসোর্টে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়। ঘটনার চার দিন পর স্থানীয় একটি খাল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডটি সে সময় গোটা ভারতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ঘটনায় রিসোর্টের মালিক পুলকিত আর্য এবং তাঁর দুই কর্মী সৌরভ ভাস্কর ও অঙ্কিত গুপ্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি এগিয়ে যায়। ২০২৫ সালের ৩০ মে আদালত তিন আসামিকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
তবে আদালতের রায়ের পরও অঙ্কিতার পরিবারের সব প্রশ্নের অবসান হয়নি। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। অঙ্কিতার পরিবার কথিত ওই ব্যক্তির পরিচয় ও ভূমিকা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মেয়ের হত্যার বিচার ও কথিত ‘ভিআইপি’ ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের দাবিতে অঙ্কিতার মা–বাবা দিল্লিতে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ ও দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলার মধ্যেই গত রাতে (১৪ অক্টোবর) পুলিশ তাঁদের আটক করে। পরে বৃহস্পতিবার সকালে (১৫ অক্টোবর) তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মা–বাবাকে আটকের ঘটনাই ধ্রুব রাঠির প্রতিক্রিয়ার তাৎক্ষণিক কারণ বলে তাঁর পোস্ট থেকে বোঝা যায়। তবে তাঁদের আটকের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য বা আটক করার সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডে ‘ভিআইপি’ বিতর্ক কেন
অঙ্কিতা ভাণ্ডারি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মামলাটি ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, রিসোর্টে আসা কোনো প্রভাবশালী অতিথিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য অঙ্কিতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল কি না।
অভিযোগ উঠেছিল, রিসোর্টে আসা এক প্রভাবশালী অতিথিকে বিশেষ সুবিধা দিতে অঙ্কিতাকে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ থেকেই কথিত ‘ভিআইপি’ ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
অঙ্কিতার পরিবার এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে কথিত ভিআইপি ব্যক্তির পরিচয় ও হত্যাকাণ্ডে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে অভিযোগ, দাবি এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
২০২৫ সালের ৩০ মে তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় মামলার বিচারিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু পরিবারের উত্থাপিত প্রশ্ন এবং কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা পুরোপুরি থামেনি। এ কারণেই অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্তের দাবি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
মোদিকে নিশানা করে ধ্রুব রাঠির পোস্ট
ধ্রুব রাঠি তাঁর এক্স পোস্টে অঙ্কিতার মা–বাবার পরিস্থিতি তুলে ধরে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘উনারা হলেন অঙ্কিতা ভাণ্ডারির মা–বাবা। অঙ্কিতা এমন এক তরুণী, যাকে এই একই ব্যবস্থায় হত্যা করেছে। এখন ওরা তাঁর মা–বাবাকেও রেহাই দিচ্ছে না।’
এই বক্তব্যে ধ্রুব রাঠি অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর মা–বাবাকে আটকের ঘটনাকে একই বৃহত্তর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। তাঁর পোস্টের মূল বক্তব্য হলো, মেয়ের হত্যার বিচার চাওয়া পরিবারের সদস্যদেরও যদি আন্দোলনের সময় আটক হতে হয়, তাহলে ন্যায়বিচার ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে এটি ধ্রুব রাঠির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। তাঁর মন্তব্যের পাশাপাশি মা–বাবাকে আটকের ঘটনায় পুলিশের ব্যাখ্যা, প্রশাসনের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য ছাড়া আটকের পেছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনা ছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ভারতের রাজনীতিতে ধ্রুব রাঠির ভূমিকা
ধ্রুব রাঠি ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবারদের একজন। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছায়। বিশেষ করে সরকারের নীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক বক্তব্য তাঁকে ভারতীয় অনলাইন রাজনৈতিক আলোচনার পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।
সম্প্রতি ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনের প্রসঙ্গেও ধ্রুব রাঠির নাম আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন এবং সমালোচনা—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই তৈরি করে।
অঙ্কিতা ভাণ্ডারি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর সাম্প্রতিক পোস্টও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এখানে তিনি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার প্রসঙ্গ তোলেননি; বরং ন্যায়বিচারের দাবি জানানো পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে ন্যায়বিচার ও প্রতিবাদের অধিকার
অঙ্কিতা ভাণ্ডারি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও তাঁর পরিবারের উত্থাপিত কিছু প্রশ্ন জনপরিসরে আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে কথিত ভিআইপি ব্যক্তির পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিয়ে পরিবারের দাবির কারণে বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।
মেয়ের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে মা–বাবাকে আটকের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা এবং তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ—দুটিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করাও জরুরি।
ধ্রুব রাঠির পোস্ট এই বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি নিশানা করে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন করে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে অঙ্কিতার পরিবারের বক্তব্য, পুলিশের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, অঙ্কিতা ভাণ্ডারি হত্যাকাণ্ডের বিচার, কথিত ভিআইপি বিতর্ক এবং তাঁর মা–বাবাকে আটকের ঘটনা আবারও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় উঠে এসেছে। ধ্রুব রাঠির তীব্র প্রতিক্রিয়া এই ঘটনাকে নতুন মাত্রা দিলেও পরিবারের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি এবং আটকের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/জেএন/এসএ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:০৩ অপরাহ্ণ