ইমরান খানের দলকে ঘিরে পাকিস্তানে নতুন সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১০ অপরাহ্ণ
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া এ পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাদেশিক সরকার যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। তবে পিটিআইয়ের দাবি, সন্ত্রাসবাদ দমনের যুক্তিকে সামনে রেখে মূলত দলটিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে উচ্চকক্ষ সিনেটেও প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এর আগে রোববার (১১ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় সরকার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দিয়েছিল।

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলন, ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। পিটিআই সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে।

সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ কেন্দ্রের

কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। এ অভিযোগকে সামনে রেখেই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। তাঁদের মতে, প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার  রোববার (১১ অক্টোবর) খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেয়। এর ফলে পিটিআই-নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কেন্দ্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পিটিআই। দলটির নেতারা বলছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই পাস প্রস্তাব

বুধবার (১৪ অক্টোবর) জরুরি অবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় পরিষদের প্রশ্নোত্তর পর্ব স্থগিত রাখা হয়। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার আলোচনার সূচনা করেন। পরে পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রী তারেক ফজল চৌধুরী জরুরি অবস্থা ঘোষণাসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। পরিষদের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে জানানো হয়, পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারার দ্বিতীয় শর্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়ায় প্রেসিডেন্টের জারি করা জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পরিষদ।

পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নিজ উদ্যোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে তা ১০ দিনের মধ্যে অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপন করতে হয়। সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই প্রস্তাবটি পার্লামেন্টে তোলা হয়।

জাতীয় পরিষদে আলোচনার সময় পিটিআই চেয়ারম্যান গহর আলী খান কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, তাঁর দল খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইমরান খানের স্ত্রী ও বোনদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের কী অভিযোগ রয়েছে, যার কারণে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সিনেটে উত্তপ্ত বিতর্ক, ওয়াকআউট বিরোধীদের

জাতীয় পরিষদে অনুমোদনের পর সিনেটেও প্রস্তাবটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা এ বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার প্রস্তাব উত্থাপন এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়াগত বৈধতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সিনেট চেয়ারম্যান ইউসুফ রাজা গিলানি বিরোধী সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তাঁরা স্লোগান দিতে থাকলে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো শ্রেণিকক্ষ নয়, হইচই করবেন না।’

একপর্যায়ে পিটিআইয়ের সিনেটররা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। তবে বিরোধীদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রস্তাবটি সিনেটে পাস হয়।

পিটিআই নেতা হুমায়ুন মোহমান্দ অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দলটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই পদক্ষেপের কারণ হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে সামনে আনা হলেও তা আসলে একটি অজুহাত; প্রকৃত লক্ষ্য পিটিআই।’

তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র সিনেটর ফয়সাল ওয়াদা কয়েক মাস আগেই খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারির সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এ বক্তব্য তুলে ধরে হুমায়ুন মোহমান্দ কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকার অভিযোগ করেন।

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দলটির বিরোধ চলছে। ইমরান খানের মুক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে পিটিআই আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

শাহবাজ শরিফের সরকার রোববার (১১ অক্টোবর) খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তকে পিটিআই নিজেদের রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।

জাতীয় পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় গহর আলী খান কেন্দ্রের পদক্ষেপের বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, পিটিআই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার এবং এ সমস্যা মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

পিটিআইয়ের দাবি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান (এনএপি) বাস্তবায়ন করা উচিত। দলটির মতে, সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য বিদ্যমান জাতীয় পরিকল্পনা অনুসরণ না করে একটি নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিত করা সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।

বিলাওয়াল ভুট্টোর পাল্টা আক্রমণ

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়ার পরিস্থিতির জন্য পিটিআইকে দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পিটিআইয়ের কর্মকাণ্ডই কেন্দ্রীয় সরকারকে জরুরি অবস্থা জারির মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

বিলাওয়াল এ পরিস্থিতিকে পিটিআইয়ের জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মঘাতী হামলা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতের দায় এড়াতে পারে না পিটিআই।

তিনি পিটিআইয়ের আটক সংসদ সদস্যদের বিষয়টিও আলোচনায় আনেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, সে প্রশ্ন তুলে তিনি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।

এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীরাও জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে পিটিআই-নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না। ফলে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছে।

আদালতে যাওয়ার ঘোষণা পিটিআইয়ের

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে পিটিআই। দলটির চেয়ারম্যান গহর আলী খান বলেছেন, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছে।

গহর আলী খানের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পিটিআই কখনোই পিছিয়ে ছিল না। বরং এ ধরনের নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা আদালতে পরীক্ষা করা উচিত।

পিটিআইয়ের এই আইনি পদক্ষেপের ফলে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি বিষয়টি বিচারিক পরিসরেও গড়াচ্ছে। আদালত এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তার ওপর প্রদেশটির প্রশাসনিক কাঠামো এবং কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।

গভর্নরের শাসনে প্রাদেশিক সরকারের ভবিষ্যৎ কী

জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআই-নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বললেও বিরোধী দল এটিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে যে প্রদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের জরুরি পদক্ষেপ রাজনৈতিক আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা সংকটের প্রকৃত কারণ, জরুরি অবস্থা জারির সাংবিধানিক ভিত্তি এবং প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের যথাযথ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সব মিলিয়ে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের অনুমোদন কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করালেও পিটিআইয়ের আইনি চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদে বিরোধ নিষ্পত্তি এখনো অনিশ্চিত। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কেন্দ্র-প্রদেশের বিরোধ কীভাবে সামাল দেওয়া হয়, সেটিই হবে আগামী দিনের প্রধান প্রশ্ন।

কালের আলো/জেএন/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন