একসময় অফিস-আদালতের প্রাণ, আজ বিলুপ্তির পথে টাইপরাইটার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:৪৭ অপরাহ্ণ

একসময় আদালত প্রাঙ্গণ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—প্রায় সর্বত্রই ছিল টাইপরাইটারের কদর। ছোট ছোট আঙুলের চাপে একের পর এক অক্ষর ফুটে উঠত কাগজে। চারপাশে শোনা যেত যন্ত্রটির চিরচেনা ‘খটখট’ শব্দ। মামলার আর্জি, হলফনামা, চুক্তিনামা, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরিতে টাইপরাইটার ছিল অপরিহার্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, কম্পিউটারের বিস্তার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতিতে একসময়ের জনপ্রিয় এই যন্ত্র এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

জেলা ও উপজেলা শহরের আদালতপাড়া কিংবা অফিস-আদালতের আশপাশে ঘুরলেও আগের মতো টাইপরাইটার নিয়ে বসে থাকা টাইপিস্টদের দেখা মেলে না। যন্ত্রটির সেই পরিচিত শব্দও এখন অনেকটাই অতীত। একসময় যে টাইপরাইটার ছিল বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন, আজ তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে ঠাঁই নিচ্ছে স্মৃতিতে।

তবে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের কিছু স্মারক এখনো টিকে আছে। মৌলভীবাজারের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ নামের একটি আগর-আতর কোম্পানিতে যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি প্রাচীন টাইপরাইটার। বর্তমানে এটি দিয়ে কোনো কাজ করা হয় না। প্রতিষ্ঠানের শোভা বাড়ানোর পাশাপাশি অতীতের প্রযুক্তি ও কর্মজীবনের স্মৃতি ধরে রাখতেই যন্ত্রটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

টাইপরাইটারের উত্থান, বদলে গেল লেখার জগৎ

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৬৮ সালে মার্কিন উদ্ভাবক ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস টাইপরাইটারের নকশা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর পাঁচ বছর পর, ১৮৭৩ সালে রেমিংটন অ্যান্ড সন্সের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে টাইপরাইটার বাজারজাত শুরু হয়। পরে ব্রিটিশদের হাত ধরে ১৮৯০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে টাইপরাইটারের প্রচলন ঘটে বলে জানা যায়।

ক্রমে এই যন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। দাপ্তরিক চিঠিপত্র, আবেদন, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং নানা ধরনের দলিল তৈরি করতে টাইপরাইটার হয়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। হাতে লেখার তুলনায় দ্রুত ও গোছানোভাবে নথি প্রস্তুত করার সুবিধার কারণে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে।

বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর বড় একটি সময়জুড়ে টাইপরাইটার ছিল দাপ্তরিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টাইপিস্ট ও সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত ব্যক্তিরা এই যন্ত্রের সাহায্যে নথিপত্র প্রস্তুত করতেন। দক্ষ টাইপিস্টদের চাহিদাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু আশির দশকের পর থেকে কম্পিউটার ও আধুনিক লেখালেখির প্রযুক্তির প্রসারে টাইপরাইটারের ব্যবহার ক্রমে কমতে থাকে। কম্পিউটারে লেখা সংশোধন, সংরক্ষণ, পুনর্মুদ্রণ এবং দ্রুত নথি তৈরি করার সুবিধা থাকায় দাপ্তরিক কাজের ধরন বদলে যায়। একসময় যে যন্ত্র ছাড়া অফিসের কাজ কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে।

আদালতপাড়ায় টাইপরাইটারেই চলত সংসার

মৌলভীবাজার আদালতের পাশে দীর্ঘদিন টাইপরাইটার দিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন কনকপুর ইউনিয়নের অজিত দাশ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই প্রবীণ টাইপিস্টের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাইপরাইটারকেন্দ্রিক কর্মজগতের দীর্ঘ স্মৃতি।

অজিত দাশ জানান, স্বাধীনতার আগ থেকেই আদালতের পাশে একটি ছোট টেবিল ও টুল নিয়ে বসতেন তিনি। নিজের টাইপরাইটারে লিখতেন মামলার আর্জি, হলফনামা, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ, চুক্তিনামাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আদালতে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা এখনকার তুলনায় কম থাকলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি মামলার আর্জি ও অন্যান্য নথি টাইপ করতেন তিনি। তাঁদের পরিবারের একটি টাইপরাইটারই ছিল জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় টাইপের কাজের পাশাপাশি মামলার আর্জি গুছিয়ে লেখার ক্ষেত্রেও দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন অজিত দাশ। তিনি জানান, অনেক সময় জুনিয়র আইনজীবীরা বাদীপক্ষের লোকজনকে তাঁর কাছে পাঠাতেন, যাতে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে মামলার আর্জি গুছিয়ে লিখে দিতে পারেন।

এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পেশার দক্ষতার গল্প নয়; এটি এমন এক সময়ের চিত্র, যখন আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমে টাইপিস্টদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হতো অসংখ্য নথি, যা আদালত ও মানুষের আইনি কার্যক্রমের অংশ হয়ে থাকত।

দুজন থেকে বেড়েছিল টাইপিস্টের সংখ্যা

অজিত দাশের স্মৃতিতে, তিনি যখন টাইপরাইটার নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন আদালতের পাশে এ পেশায় ছিলেন আর একজন। তাঁরা দুজন দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পরে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন এবং দাপ্তরিক কাজের পরিমাণও বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় আদালতপাড়ায় টাইপরাইটার ও টাইপিস্টের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

সরকারি বিভিন্ন অফিসে টাইপরাইটার ছিল নিয়মিত কাজের অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে সাঁটমুদ্রাক্ষরিকেরা টাইপরাইটারে চিঠিপত্র, প্রতিবেদন, আদেশ ও অন্যান্য দাপ্তরিক নথি তৈরি করতেন। দ্রুত ও নির্ভুলভাবে টাইপ করতে পারা ছিল তাঁদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

কিন্তু কম্পিউটার চালু হওয়ার পর সেই কর্মপরিবেশ বদলে যায়। এখনো বিভিন্ন দপ্তরে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা থাকলেও তাঁদের কাজের ধরন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। টাইপরাইটারের জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা।

অজিত দাশের মতো প্রবীণ টাইপিস্টদের কাছে তাই টাইপরাইটার কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি তাঁদের কর্মজীবন, পারিবারিক জীবিকা এবং সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী।

মৌলভীবাজারে স্মৃতি হয়ে টিকে আছে প্রাচীন টাইপরাইটার

প্রযুক্তির বিবর্তনে টাইপরাইটারের ব্যবহার কমে গেলেও মৌলভীবাজারের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ কোম্পানিতে একটি প্রাচীন টাইপরাইটার এখনো যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি আর দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হয় না। বরং অতীতের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার স্মারক হিসেবে রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে।

‘আগর ফ্রেগরেন্স’-এর সঙ্গে যুক্ত শামীম আক্তার হোসেন জানান, তাঁদের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু সব সময় প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে আগ্রহী। সেই ধারাবাহিকতায় টাইপরাইটারটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, মৌলভীবাজারের কার্যালয়ে সংরক্ষিত টাইপরাইটারটি এখনো চকচকে এবং দেখতে অনেকটা নতুনের মতো। নতুন প্রজন্মের অনেকে যন্ত্রটি দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হন। অন্যদিকে, প্রবীণেরা এটি দেখে অতীতের কর্মজীবন ও স্মৃতিচারণ করেন।

শামীম আক্তার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগর ফ্রেগরেন্সের কার্যালয়ে আসা অনেক দর্শনার্থী তাঁদের মুঠোফোনে টাইপরাইটারটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। এভাবেই একসময়ের বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তির একটি নিদর্শন নতুন প্রজন্মের সামনে অতীতের গল্প তুলে ধরছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি, হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্কৃতি

টাইপরাইটারের বিলুপ্তির পথে যাত্রা মূলত প্রযুক্তির পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। কম্পিউটার লেখালেখিকে করেছে দ্রুততর, সম্পাদনাযোগ্য ও সহজে সংরক্ষণযোগ্য। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার নথি তৈরি এবং আদান-প্রদানের পদ্ধতিকেও বদলে দিয়েছে।

তবে প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিচিত কর্মসংস্কৃতি। টাইপিস্টের টেবিল, কাগজ সাজিয়ে রাখা, কার্বন কপি তৈরি, টাইপের ভুল সংশোধনের জন্য বিশেষ কৌশল—এসবই এখন অনেকের কাছে অতীতের স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বাস্তবে টাইপরাইটারে লেখা দেখেনি; তাদের কাছে যন্ত্রটি এখন কৌতূহলের বিষয়।

একসময় আদালতপাড়া ও অফিসের পরিচিত দৃশ্য ছিল টাইপরাইটার নিয়ে বসে থাকা কর্মীদের ব্যস্ততা। আজ সেই দৃশ্য বিরল। কোথাও পুরোনো যন্ত্র পড়ে আছে, কোথাও তা সংগ্রহে রাখা হয়েছে স্মারক হিসেবে। আর অজিত দাশের মতো প্রবীণদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে সেই সময়, যখন একটি টাইপরাইটারই ছিল সংসার চালানোর ভরসা।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন