ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় বছরের পর বছর প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসছে—এটিকে দেশের জন্য লজ্জার বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীসহ দেশের পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও উদ্যোগী হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরিবেশ ও বন রক্ষায় শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষকেও সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নবিষয়ক সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
ঢাকার দূষণ কমাতে সবার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকছে। দেশের রাজধানীর এমন পরিস্থিতি পরিবর্তন করা জরুরি। এ জন্য প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, পরিবেশ সংরক্ষণের কাজ তত সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ ও বন রক্ষায় নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের পৃথক পরিকল্পনা রাখার ওপরও জোর দেন। শুধু নীতিমালা বা প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর প্রচার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
‘নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করতে হবে’
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের জন্য আরও কিছু করার সক্ষমতা রয়েছে। দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগকে কাজে লাগানো উচিত।
তিনি বলেন, ‘আপনার যেটা ডিউটি, তার থেকে কিন্তু একটু বেশি করার সক্ষমতা আপনার রয়েছে। দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ সবার কাছে আসে না। যারা আজ দায়িত্বশীল অবস্থানে রয়েছেন, তাদের সেই সুযোগ রয়েছে। শুধু নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেই থেমে গেলে হবে না। দেশের মানুষের জন্য আরও কিছু করার চেষ্টা থাকতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রত্যেকে নিয়মিত অফিসের দায়িত্ব পালন করলেও দেশের পরিবেশের অবনতি হলে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়বে। তাই পরিবেশ রক্ষাকে শুধু দাপ্তরিক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহতাআলা আমাদের একটা সুযোগ দিয়েছেন এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য কিছুটা করার। আপনি নয়টা-পাঁচটা অফিস করতেই পারেন। এরপরে যদি আপনি কিছু না করেন, কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু পরিবেশটা যদি খারাপ হয়ে যায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, আপনার পরবর্তী প্রজন্ম তো দেশেই থাকবে।’দেশের পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে হলে সবাইকে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কিছুটা বেশি কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ছয় মাসের মধ্যে মাদার ট্রি চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত
সভায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের মাদার ট্রি বা বীজ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাতৃগাছ চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানোর কার্যক্রমও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে গাছ লাগানোর পর সেগুলোর পরিচর্যা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোপণ করা চারাগুলো বেঁচে আছে কি না, সেগুলোর বৃদ্ধি ঠিকমতো হচ্ছে কি না—তা যাচাই করতে নিজস্ব লোক পাঠিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, রোপণ করা গাছের টিকে থাকা ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য নিয়মিত পরিচর্যা, তদারকি এবং বাস্তব অগ্রগতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বনায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বনায়ন বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে সভায়। এ অঞ্চলে বনভূমি সংরক্ষণ এবং নতুন গাছ লাগানোর কার্যক্রম কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়গুলো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম গাছ লাগালে সেই ঘাটতি পূরণে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের রোপণ করা গাছের পরিচর্যা ও তদারকি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, গাছ লাগানোর কর্মসূচি সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি গাছের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ছাদবাগান ও স্কুলবাগান বাড়ানোর তাগিদ
মানুষের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের জন্য প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর জায়গা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ছাদবাগান, স্কুলবাগান এবং বিভিন্ন ভবনে বাগান তৈরিতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।
শহরাঞ্চলে সবুজের পরিমাণ বাড়ানো এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃতির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়েও বাগান তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হলে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা
সভায় প্রধানমন্ত্রী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সব মানুষ এর সুফল পাবে।এই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে রোপণ করা গাছের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাইয়ের ওপর সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনায়ন বৃদ্ধি, গাছের পরিচর্যা এবং জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৭ অপরাহ্ণ