রেমিট্যান্সে গতি, রিজার্ভে শক্তি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:৪৭ অপরাহ্ণ

দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈদেশিক দায় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য আনতে নীতিগতভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আগস্টে দেশে প্রবাস-আয় এসেছে প্রায় ২৯৭ কোটি ডলার। জুলাইয়েও রেমিট্যান্সের প্রবাহ ছিল প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার। এই প্রবাহের ইতিবাচক প্রভাব শুধু রিজার্ভের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াচ্ছে, আমদানি দায় পরিশোধে সহায়তা করছে এবং বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সংকট তৈরির ঝুঁকি কমাচ্ছে।

  • প্রবাস-আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহে বাড়ছে ডলারের জোগান
  • রেমিট্যান্স প্রায় ৩০০ কোটি ডলার, রিজার্ভ ৩৭.৩৫ বিলিয়ন
  • বাজারের উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা কিনে সঞ্চিতি শক্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

রেমিট্যান্সের ডলার যেভাবে শক্তি জোগায় অর্থনীতিকে
প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠালে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে প্রাপকের হিসাবে টাকা জমা দেয়। একই সময়ে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদে ডলার যুক্ত হয়। এই ডলার পরে আমদানি বিল পরিশোধ, বিদেশি সরবরাহকারীর পাওনা মেটানো কিংবা অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হয়।

কোনো ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডলার থাকলে তা আন্তঃব্যাংক বাজারে বিক্রি করা সম্ভব। আবার বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়াতে পারে। বিপরীতে আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ করে। এই ব্যবস্থার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ অর্থনীতির বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকেও সহায়তা করে। অর্থাৎ, রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলার সরাসরি রিজার্ভে জমা না হলেও সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

৩৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভে নতুন আস্থা
রিজার্ভের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। জুলাই শেষে কিছুটা কমে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে নামলেও আগস্ট শেষে আবার বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

রেমিট্যান্সের প্রবাহ, রপ্তানি আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার সম্মিলিত প্রভাব রিজার্ভের এই অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। শক্তিশালী রিজার্ভ দেশের প্রয়োজনীয় আমদানি অব্যাহত রাখা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে সময়মতো অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। তবে রিজার্ভের উন্নতি ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলোকে শক্তিশালী রাখা এবং ব্যয়ের চাপ কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি।

আমদানি ব্যয় মিটিয়েও ডলারের জোগান বাড়ছে
দেশে ডলারের চাহিদার বড় অংশ আসে আমদানি ব্যয় থেকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আমদানি বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৩৭ কোটি ডলার, যা এক বছরের ব্যবধানে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম। এই পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ধরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে সহায়তা দিচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাজারে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

উদ্বৃত্ত ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নেয়। সম্প্রতি প্রায় তিন মাসের বিরতি শেষে ১ সেপ্টেম্বর চারটি ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা উদ্বৃত্ত ডলারের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহের সময় বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে গেলে বাজারে ডলার বিক্রি করার সক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা।

ডলার কেনা ও বিক্রির এই পদক্ষেপ দেখায়, বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারছে। এতে বিনিময় হারের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সামলানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখার সুযোগ বাড়ে।

প্রবাস-আয় এবার উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানোর সুযোগ
অর্থনীতি-বিশ্লেষক মাজেদুল হকের মতে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ বাড়ায় এবং রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। রিজার্ভের উন্নতি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অর্থায়নে দেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক লেনদেনে আর্থিক সক্ষমতা দৃঢ় হলে বিদেশি অংশীদারদের কাছেও দেশের অবস্থান ইতিবাচক হয়।

তাঁর মতে, প্রবাস-আয়ের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করা গেলে কর্মসংস্থান, আয় ও সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব। ক্ষুদ্র উদ্যোগ, শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য আয় সৃষ্টিকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়লে রেমিট্যান্সের সুফল সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছড়িয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতের আস্থা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/জেএন/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন