ভুলে যাওয়া ক্যান-ক্যামেরায় ৮ বছরের সূর্যের বিরল দৃশ্য

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
একটি সাধারণ পানীয়ের ক্যান, সামান্য ফটোগ্রাফিক কাগজ আর সূর্যের আলো—এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানের জগতে বিস্ময় জাগানো এক ছবি। কোনো আধুনিক ক্যামেরা কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং ভুলে পড়ে থাকা একটি ক্যান-ক্যামেরা টানা আট বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারণ করেছে আকাশে সূর্যের চলার পথ। ছবিটিতে সূর্যের ২ হাজার ৯৫৩টি আলাদা আলোর রেখা দেখা গেছে, যা পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তনকে তুলে ধরে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের বেফোর্ডবেরি অবজারভেটরিতে ঘটে এই ব্যতিক্রমী ঘটনা। আলোকচিত্রী রেজিনা ভালকেনবর্গ ২০১২ সালে সেখানে একটি সাধারণ পানীয়ের ক্যান দিয়ে তৈরি পিনহোল ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ক্যামেরাটি যে এত দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের গতিপথের ছবি ধারণ করবে, তা তাঁর পরিকল্পনায় ছিল না।

কীভাবে তৈরি হলো আট বছরের ছবি?

২০১২ সালে অবজারভেটরিতে ক্যান দিয়ে তৈরি ক্যামেরাটি স্থাপন করেন রেজিনা ভালকেনবর্গ। ক্যামেরাটির ভেতরে রাখা হয়েছিল আলোকসংবেদনশীল ফটোগ্রাফিক কাগজ। ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করে সেই কাগজে ছবি তৈরি করার কথা ছিল। এই পদ্ধতিকে বলা হয় পিনহোল ফটোগ্রাফি।

তবে ক্যামেরাটি স্থাপনের পর সেটি দীর্ঘদিন সেখানেই পড়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটির কথা ভুলে যান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিকে ক্যামেরার ভেতরে থাকা ফটোগ্রাফিক কাগজে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। এভাবেই একটি সাধারণ ক্যান হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি আলোকচিত্র ধারণের মাধ্যম।

সূর্যের গতিপথে ধরা পড়ল ঋতু পরিবর্তনের ছাপ

পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করে এবং পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থানের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে আকাশে সূর্যের আপাত অবস্থান ও দৈনিক পথ বদলে যায়। গ্রীষ্মে সূর্য সাধারণত আকাশে তুলনামূলক উঁচু পথে চলে, আর শীতকালে তার পথ থাকে নিচু।

ক্যান-ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো ফটোগ্রাফিক কাগজে পড়ায় তৈরি হয় একের পর এক উজ্জ্বল রেখা। রেখাগুলোর অবস্থান ও দৈর্ঘ্যের পার্থক্য থেকে বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আকাশপথের পরিবর্তন বোঝা যায়।

ছবিটিতে মোট ২ হাজার ৯৫৩টি আলোর রেখা শনাক্ত করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু রেখার মধ্যে ফাঁকও দেখা যায়। মেঘ সূর্যের আলো আটকে দেওয়ায় এমন ফাঁক তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

২০২০ সালে খুঁজে পাওয়া গেল ভুলে যাওয়া ক্যামেরা

২০১২ সালে স্থাপন করা ক্যামেরাটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আবার খুঁজে পাওয়া যায়। তখন সেটির ভেতরে তৈরি হওয়া ছবিটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ের সূর্যপথ একটিমাত্র আলোকচিত্রে ধরা পড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যামেরাটির এক্সপোজারের সময় ছিল প্রায় আট বছর ৩০ দিন। এত দীর্ঘ সময় ধরে আলো ধারণ করার কারণে ছবিটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এটি শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য নয়; দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আকাশের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করারও এক অনন্য উদাহরণ।

ছবিটির নাম সোলারগ্রাফ

দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আপাত গতিপথ ধারণ করার এই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি ছবিকে বলা হয় ‘সোলারগ্রাফ’। এতে সাধারণত একটি ছোট ছিদ্রযুক্ত ক্যামেরা ও আলোকসংবেদনশীল কাগজ ব্যবহার করা হয়। সূর্যের আলো প্রতিদিন কাগজে রেখা তৈরি করে, আর দীর্ঘ সময় ধরে সেই রেখাগুলো একত্র হয়ে একটি ছবিতে পরিণত হয়।

এই পদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, এতে ব্যয়বহুল ক্যামেরা বা জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো পড়তে থাকায় আলোকসংবেদনশীল কাগজের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও আবহাওয়ার প্রভাব ছবির ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাধারণ ক্যান থেকে অসাধারণ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ছবির এক্সপোজারের সময় ছিল প্রায় আট বছর ৩০ দিন। দীর্ঘতম ফটোগ্রাফিক এক্সপোজারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ছবিটি আলোচনায় আসে।

ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও আলোকচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের জন্য সব সময় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। কখনো সাধারণ উপকরণ, দীর্ঘ সময় এবং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম মিলেই তৈরি করতে পারে ব্যতিক্রমী ফলাফল।

যে ক্যান-ক্যামেরাটি একসময় ভুলে পড়ে ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত আট বছরেরও বেশি সময়ের সূর্যপথকে এক ফ্রেমে ধরে রাখে। ছবিটি যেন একটি মুহূর্তের দৃশ্য নয়, বরং সময়ের সঙ্গে আকাশের পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস—যেখানে প্রতিটি আলোর রেখা সূর্যের আরেকটি দিনের সাক্ষ্য বহন করে।

কালের আলো/এএন/এসএ
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন