তরুণদের নেতৃত্ব, মেধা ও উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়েই ভবিষ্যতের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, তরুণদের শুধু জিপিএ-৫ অর্জনের পেছনে ছুটলে চলবে না; নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ইতিবাচক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় সংসদের এলডি হলে ফিউচার বাংলাদেশের আয়োজনে বাংলাদেশ ইয়ুথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস-২০২৬ (বিওয়াইএমইউএন) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয়
ডেপুটি স্পিকার বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে।এমন দেশ গড়তে শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে দেশের উন্নয়ন এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ সুরক্ষিত থাকবে।
বাংলাদেশের বড় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তরুণেরা
বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তরুণদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, দেশের বড় বড় আন্দোলনে তরুণেরাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। সামাজিক মর্যাদা ও সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠার দাবিতেও তাঁরা বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) চূড়ান্ত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের অনেকেই ছিলেন তরুণ। ডেপুটি স্পিকার বলেন, তরুণেরা সব সময় বৈষম্য ও অসম সুযোগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতেও দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতিতে তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
‘দেশকে নতুন করে এগিয়ে নিতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে’
বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে কায়সার কামাল বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে পড়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশকে নতুন করে এগিয়ে নিতে তরুণদের সক্রিয় হতে হবে। তাঁর মতে, দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের দিকে মনোযোগী হলে হবে না। নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান ও চিন্তাশক্তিকে জাতীয় উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলেও তরুণদের দেশে ফিরে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। দেশের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি বলেও উল্লেখ করেন ডেপুটি স্পিকার।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান
তরুণদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পরামর্শ দিয়ে কায়সার কামাল বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা তরুণদের জানা প্রয়োজন। এ জন্য তাঁদের জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখা উচিত। সংসদীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত উপস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া সম্ভব। এসব বিষয়ে জানার মধ্য দিয়ে তরুণেরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তরুণদের ভূমিকা রাখতে হবে।
মতপার্থক্যকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখার পরামর্শ
গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ভিন্নমত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিষয়। কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তাঁর যুক্তি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। মতপার্থক্যকে বিরোধ হিসেবে না দেখে যুক্তি, আলোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে ভিন্ন চিন্তা ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার বিকল্প নেই বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তরুণদের মধ্যে এ ধরনের গণতান্ত্রিক মনোভাব গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
৬৪ জেলা থেকে প্রায় ৫০০ তরুণের অংশগ্রহণ
দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইয়ুথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস-২০২৬ সম্মেলনের প্রথম দিনে দেশের ৬৪ জেলা থেকে আসা দুই শতাধিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০০ তরুণ প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। ফিউচার বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে তরুণদের নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে চিন্তাভাবনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডোলান্ড।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:৩৭ অপরাহ্ণ