খামার থেকে খাবার টেবিল, প্রতিটি ধাপে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:২১ অপরাহ্ণ

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সবার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য সহজলভ্য করতে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার বা নির্ভুল কৃষি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, উন্নত কৃষিযন্ত্র এবং জলবায়ু-সহনশীল উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, ক্ষুদ্র কৃষকদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।

খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টিকেও গুরুত্ব

সেমিনারে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দেশের কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। এখন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষিকে লাভজনক ও সময়োপযোগী করতে ‘প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার’ বা নির্ভুল কৃষির ওপর নীতিগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে জমির অবস্থা, মাটির গুণাগুণ, আবহাওয়া, পানির প্রয়োজন এবং ফসলের বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষিকাজ পরিচালনা করা যায়। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী সার, পানি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়। কৃষি সচিব আরও বলেন, খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি। শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করলেই হবে না, সেই খাদ্য যেন মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন কৃষি সচিব। তিনি জানান, ড্রোন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নির্ভুলতা আনা, রোগবালাইয়ের ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং জমি ও সম্পদের কার্যকর ব্যবহার সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিতে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়লে তরুণেরা প্রচলিত কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও কৃষিপণ্য বিপণনের মতো ক্ষেত্রেও যুক্ত হতে পারবেন। সেমিনারে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকারও প্রশংসা করা হয়।

ক্ষুদ্র কৃষকদের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

ইফাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন এবং কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইফাদ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে ‘স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট’ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার মানসম্মত বীজ, ফার্মার বিজনেস স্কুল এবং সৌরচালিত সেচের সুবিধা পাচ্ছে। ভ্যালেন্টাইন আচানচো আরও বলেন, নতুন চালু হওয়া ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লাইমেট প্রজেক্ট’ গ্রামীণ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

জিনোমিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিশেষজ্ঞ ইফতেখারুদ্দৌলা বলেন, কৃষির টেকসই রূপান্তরের জন্য জেনেটিক, ব্যবস্থাপনাগত ও স্থানভিত্তিক—এই তিন ধরনের সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন। জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষিতে শুধু উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করলেই চলবে না; যন্ত্রপাতির সঠিক প্রয়োগ, আগাম সতর্কতাব্যবস্থা, আধুনিক বাজারতথ্য এবং ক্রপ জোনিং বা ফসলের উপযোগী অঞ্চল নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ব্যবস্থার সমন্বয় কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করতে এবং উৎপাদন পরিকল্পনা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। ইফতেখারুদ্দৌলা আরও বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে জীবনধারণমূলক কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনকে টেকসই করতে সাইট ও জিন এডিটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিংয়ের সমন্বয়ে জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ

বার্কের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, চাল, গম, ডাল, তেল ও ফলমূলের মতো বৈচিত্র্যময় খাদ্যের চাহিদা পূরণে উৎপাদন ও প্রাপ্যতার মধ্যে পার্থক্য কমাতে হবে। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ফসলের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যা কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুষম সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বিপণনব্যবস্থা পৌঁছে দিতে পারলে টেকসই কৃষি রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে। কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার ও বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও ভোগের প্রতিটি ধাপে নজরদারি প্রয়োজন। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বাড়ানো—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন