দিনে গরম, ভোরে কুয়াশা—পঞ্চগড়ে বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার চিত্র

পঞ্চগড় সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৪৩ অপরাহ্ণ

আশ্বিনের শেষবেলা। বাংলা পঞ্জিকার হিসাবে কার্তিকের আগমন আর মাত্র দু-এক দিনের অপেক্ষা। এরই মধ্যে দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে অনুভূত হতে শুরু করেছে শীতের আগমনী বার্তা। ভোরের আকাশে মেঘের আনাগোনার বদলে এখন চারপাশ ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশায়। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু আর উত্তরের হিমেল বাতাস জানান দিচ্ছে, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে ঋতুর রূপ।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে। সূর্যের আলো ফুটলেও সকাল সাতটা পর্যন্ত অনেক জায়গায় দৃশ্যমানতা ছিল কম। মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। ভোরের এই কুয়াশা প্রকৃতিতে শীতের আবহ তৈরি করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নিয়ে এসেছে পরিবর্তনের আভাস।

ভোরে তাপমাত্রা ১৯.১ ডিগ্রি, দিনে থাকছে গরম

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে পঞ্চগড়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ দিনের বেলা রোদের তেজ থাকলেও রাত গভীর হওয়ার পর থেকে ভোর পর্যন্ত আবহাওয়ায় অনুভূত হচ্ছে শীতের আমেজ। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের দিকে আগের মতো গরম অনুভূত হচ্ছে না। অনেকের এখন আর ফ্যান চালানোর প্রয়োজন পড়ছে না। মধ্যরাতের পর হালকা কাঁথা কিংবা পাতলা কম্বল গায়ে জড়াতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভোরে উত্তরের দিক থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস শীতের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট করে তুলছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার এই পার্থক্য পঞ্চগড়ের আবহাওয়ায় মৌসুমি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ভোরে তাপমাত্রা কমে যাওয়া ও কুয়াশা দেখা দিলেও দিনের বেলা গরমের অনুভূতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

শীতের আগমন সবার আগে অনুভূত হয় পঞ্চগড়ে

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে শীতের প্রভাব তুলনামূলক আগে অনুভূত হয়। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া এলাকায় শীতের মৌসুমে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার নজির রয়েছে। এ কারণে পঞ্চগড়কে প্রায়ই বাংলাদেশের ‘শীতের রাজধানী’ বলা হয়। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসংলগ্ন অঞ্চল হিমালয়ঘেঁষা ভৌগোলিক পরিবেশের কাছাকাছি অবস্থিত। ভারতের শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের মতো এলাকাও এ অঞ্চলের তুলনামূলক কাছাকাছি। উত্তরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শীতল বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে পঞ্চগড়ে শীতের অনুভূতি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক এলাকার আগেই দেখা দিতে পারে।

শীতের মৌসুমে তেঁতুলিয়ার নাম বিশেষভাবে আলোচনায় আসে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে। অতীতের রেকর্ডও এর প্রমাণ দেয়। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল বলে আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

কুয়াশার সকালে বদলে যাচ্ছে জনজীবন

পঞ্চগড়ের ভোরের কুয়াশা শুধু প্রকৃতির দৃশ্যপটই বদলে দিচ্ছে না, কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাতেও যোগ করছে শীতের নতুন অনুভূতি। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পাথরশ্রমিকদের হালকা গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে নদীতে নামতে দেখা গেছে। অন্যদিকে চা-শ্রমিকেরা শিশিরভেজা সবুজ চা-পাতার মধ্যে কাজ করছেন। রিকশাচালক, কৃষক ও দিনমজুরদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য ভোরের ঠান্ডা বাতাস বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। দিনের কাজ শুরু করার আগেই তাঁদের অনেককে গায়ে অতিরিক্ত কাপড় জড়াতে হচ্ছে। তবে দিনের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডার অনুভূতি কমে আসছে। স্থানীয়দের কাছে এই আবহাওয়া একদিকে যেমন শীতের আগমনের আনন্দ নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে সামনে তাপমাত্রা আরও কমলে দৈনন্দিন কাজ ও জীবনযাত্রায় বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে ঋতুচক্রের পরিচিত রূপে পরিবর্তন

গত কয়েক বছরে পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। এবার বর্ষা মৌসুমেও ভোরের দিকে কুয়াশা দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঋতুভেদে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিচিত ধরনে পরিবর্তন মানুষের নজরে আসছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া তাপমাত্রার ওঠানামায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দিনে কুয়াশা বা তাপমাত্রার পরিবর্তনকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তায় তৈরি হচ্ছে শীতের আবহ

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এ অঞ্চলে শীতের আবহ তৈরি হয়েছে। ভোরে কুয়াশা দেখা দিলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে যাচ্ছে। ভোরের তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে আসাকে ঋতু পরিবর্তনের একটি লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাপমাত্রা, কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা আগামী দিনগুলোতে কেমন থাকবে, তা নির্ভর করবে আবহাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।

শীতের অপেক্ষায় উত্তরের জনপদ

আশ্বিনের বিদায়বেলায় পঞ্চগড়ের ভোরে কুয়াশার উপস্থিতি যেন শীতের আগমনের নীরব ঘোষণা। শিশিরভেজা ঘাস, হিমেল বাতাস আর কুয়াশায় ঢাকা মহাসড়ক—সব মিলিয়ে উত্তরের জনপদে তৈরি হয়েছে শীতের প্রাথমিক আবহ। এখনো দিনের বেলায় রোদের তেজ রয়েছে। কিন্তু রাত গভীর হলে ও ভোরের দিকে ঠান্ডা বাড়ছে। কার্তিকের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই আবহ আরও কীভাবে বদলায়, সেদিকেই নজর থাকবে স্থানীয় বাসিন্দাদের। হিমালয়ঘেঁষা পঞ্চগড়ে শীতের প্রস্তুতি তাই শুরু হয়ে গেছে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন