বাংলাদেশকে নতুন মাদকের বাজারে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক পাচারচক্র। থাইল্যান্ড থেকে ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে আকাশপথে কুশ এনে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে চক্রটি। পাচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পোশাক, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়াল। বিমানবন্দরে ধারাবাহিক অভিযানে একাধিক চালান ও বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় সামনে এসেছে মাদকটির বিস্তারের নতুন কৌশল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ, বিদেশি পাচারকারীদের পাশাপাশি দেশীয় সহযোগীদের সক্রিয়তা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
- ভারতীয় নাগরিকদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে দেশে মাদক ছড়ানোর অভিযোগ
- বিমানবন্দর ও সীমান্তকে ঘিরে সক্রিয় পাচারচক্র
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে কুশের একাধিক চালান জব্দ হয়েছে। গত জুলাই ও আগস্টে পাঁচটি পৃথক অভিযানে প্রায় ৩০ কেজি কুশ উদ্ধার এবং ভারতীয় তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বাইরে সীমান্তেও চালান আটকের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় নাগরিক অভিজিৎ দাসের কাছ থেকে চার কেজি ২৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, ভারতীয় শাড়ির নিচে লুকিয়ে তিনি মাদকটি দেশে এনেছিলেন।
তিন দেশের যোগসাজশ, দেশীয় বাজারে বিস্তারের পরিকল্পনা
ডিএনসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, থাইল্যান্ডের ব্যাংককভিত্তিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কুশ সংগ্রহ করে ভারতীয় বাহকেরা বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। পরে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই কাজে ভারতের নিম্ন আয়ের মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়েকজন মাদক কারবারিকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক ভারতীয় নাগরিকের জিজ্ঞাসাবাদেও স্থানীয় সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
পাচারের রুট হিসেবে বিমানবন্দরের পাশাপাশি স্থলসীমান্ত ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডিএনসির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কয়েক দিন অবস্থান করে চালান হস্তান্তরের পর চক্রের সদস্যরা বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে যায়। অন্যদিকে, গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১২ কেজি কুশসহ একজন গ্রেপ্তার হন। ফলে আকাশপথ ও স্থলপথ—দুই দিকেই নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।
উচ্চমাত্রার নেশা, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি
কুশ মূলত উচ্চমাত্রার টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) সমৃদ্ধ গাঁজাজাতীয় মাদক। এর মনঃপ্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান বেশি থাকায় সেবনে বিচারবোধ, স্মৃতিশক্তি ও স্বাভাবিক চিন্তাপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে গুরুতর মানসিক ও শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও রয়েছে। ডিএনসির পরীক্ষাগার বিশ্লেষণে মাদকটির উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে তরুণদের মধ্যে কুশের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিজাত পরিবারের তরুণদের কাছে এর চাহিদা থাকার তথ্যও তদন্তে এসেছে। উচ্চমূল্যের কারণে মাদকটি সীমিত পরিসরের বাজারে বিক্রি হলেও সেই বাজার বিস্তারের চেষ্টা করছে পাচারকারীরা।
শুধু চালান জব্দ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান
বারবার চালান উদ্ধার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আরও মাদক দেশে ঢুকেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই বাহক গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, অর্থায়নকারী ও স্থানীয় পরিবেশকদের শনাক্ত করা জরুরি। বিমানবন্দরে যাত্রী ও পণ্যের ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি, সীমান্ত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কুশের বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান সফল হলেও চাহিদা ও স্থানীয় বিতরণব্যবস্থা অক্ষত থাকলে নতুন চালানের পথ বন্ধ করা কঠিন হবে।
কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:০৪ অপরাহ্ণ