সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোথায়? আলিফ হত্যা নিয়ে উদ্বেগ আসকের

নেত্রকোনা সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:২৪ অপরাহ্ণ

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিবৃতিতে আসক এ দাবি জানায়। সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা শুধু একজন মানুষের জীবনের অধিকার কেড়ে নেয় না, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারের জন্যও গুরুতর হুমকি তৈরি করে।

আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ

আসকের বিবৃতিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে গুলি করা হয়। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আলিফ ফকির এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন। আগের হামলার পরও একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে গুলি করে হত্যার ঘটনা গভীর উদ্বেগের। আসকের মতে, কোনো সাংবাদিক আগে হামলার শিকার হওয়ার পরও তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

সাংবাদিক হত্যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি

আসক মনে করে, একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা কেবল ব্যক্তির জীবনের ওপর আঘাত নয়; এটি সমাজে স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে সাংবাদিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ, অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টায়। ভয়ভীতি ও সহিংসতার আশঙ্কায় সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার মুখে পড়লে জনগণের তথ্য জানার সুযোগও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবিধান ও আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সুরক্ষিত অধিকার

বিবৃতিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছে আসক। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার এবং ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি—আইসিসিপিআরের ৬ ও ১৯ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে জীবনের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। আসকের বক্তব্য, এসব অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।

তদন্তে প্রভাব বা পক্ষপাতের সুযোগ থাকা উচিত নয়

সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রসঙ্গে আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো অবহেলা, প্রভাব বা পক্ষপাতের সুযোগ থাকা উচিত নয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংস্থাটি তদন্তপ্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান

বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসক বলেছে, সাংবাদিকেরা যাতে কোনো ধরনের হুমকি বা আশঙ্কা ছাড়াই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থাটির মতে, স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট পেশাজীবী গোষ্ঠীর স্বার্থের বিষয় নয়। এটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন