চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ডে, শান্তার স্বপ্নজয়ের গল্প

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:১০ অপরাহ্ণ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রমিক লাইনের ছোট্ট একটি ঘর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে—দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ে পা রাখতে যাচ্ছেন শান্তা যাদব। যে পরিবারের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম, সেই পরিবারের মেয়েই এবার উচ্চশিক্ষার জন্য পেয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ প্রোগ্রামে পড়াশোনার সুযোগ তাঁর জীবনের বড় অর্জন হয়ে উঠেছে। শান্তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের গল্প নয়; এটি চা বাগানের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার বার্তা। শৈশব থেকে দেখা স্বাস্থ্যসেবার সংকট, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার প্রতি অটুট আগ্রহ—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

চা শ্রমিকের ঘর থেকে স্বপ্নের শুরু

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব ও মা রীনা যাদব—দুজনই চা শ্রমিক। তাঁদের সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোই ছিল কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করা পরিবারের জন্য সহজ ছিল না। তবু ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী শান্তা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। লংলা চা বাগানের স্থানীয় স্কুলে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। এরপর কুলাউড়ার ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শান্তা নিজের জন্য তৈরি করেন নতুন সম্ভাবনার পথ।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে হার্ভার্ড

উচ্চশিক্ষার জন্য শান্তা ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। এই শিক্ষাই তাঁকে জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয়। হার্ভার্ডে যাওয়ার আগে বিশ্বের আরও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার প্রস্তাব পেয়েছিলেন শান্তা। তবে নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রোগ্রামটি বেছে নেন তিনি। প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৃত্তি নিয়ে এই প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ তাঁর শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন এবং ভবিষ্যতে নিজ এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার প্রস্তুতিও তৈরি হবে তাঁর।

চা বাগানের স্বাস্থ্যসংকটই অনুপ্রেরণা

শান্তার কাছে জনস্বাস্থ্য কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। চা বাগানে অসুস্থ হলে শ্রমিকদের চিকিৎসা পেতে কী ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়, তা তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পেতে দূরে যেতে হওয়া এবং চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর পরিচিত বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলে। নিজের কমিউনিটির মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। হার্ভার্ডে পড়াশোনার সুযোগ তাই তাঁর কাছে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং চা বাগানের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

মেয়ের স্বপ্নে আশাবাদী ছিলেন বাবা

শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শুরুতে শান্তাকে শহরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু মেয়ের মেধা, আগ্রহ ও অধ্যবসায় দেখে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন মেয়ে চা শ্রমিকের জীবন থেকে বেরিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে। শান্তার বর্তমান অর্জন সেই দীর্ঘদিনের আশা ও পরিবারের ত্যাগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যে পরিবারে মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম, সেই পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়া আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যদের নিয়েও ভাবনা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শান্তা কেবল নিজের শিক্ষাজীবন নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি। চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ সময় চা বাগানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেন। চা বাগানের অনেক শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার পথ সহজ নয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সুযোগের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন বাস্তবতায় শান্তার মতো একজন শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো অন্যদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরতে চান নিজের এলাকায়

হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষে নিজের এলাকায় ফিরে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চান শান্তা। তাঁর এই লক্ষ্য চা বাগানের মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এবং শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি কীভাবে নিজের এলাকার মানুষের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন, সেটিই এখন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন