৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সতর্কতা দিয়ে বিপাকে জাপান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৪৮ অপরাহ্ণ
ভয়াবহ ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জাপানের লাখ লাখ মানুষ। মোবাইল ফোনে একযোগে বেজে ওঠে জরুরি সতর্কসংকেত। জানানো হয়, দেশটির কাছাকাছি এলাকায় ৯.৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সতর্কবার্তা প্রত্যাহার করে নেয় জাপানের আবহাওয়া সংস্থা। পরে জানা যায়, ভূমিকম্পটির প্রকৃত মাত্রা ছিল ৬.৯। উৎপত্তিস্থল নির্ণয়ের হিসাবের ভুল থেকে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ) জাপানের আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) প্রথমে দেশটির কাছে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় ৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের খবর জানায়। জাপানে এই দ্বীপপুঞ্জ ‘চিশিমা দ্বীপপুঞ্জ’ নামে পরিচিত। সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় গণপরিবহন চলাচলও।

পরে সংস্থাটি জানায়, প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপের কাছে ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। প্রাথমিক হিসাবে ভুল হওয়ায় ভূমিকম্পের মাত্রা অনেক বেশি দেখানো হয়েছিল। পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়ার পর জরুরি সতর্কবার্তা প্রত্যাহার করা হয়।

ভুল হিসাবেই ৯.৯ মাত্রার সতর্কবার্তা

জাপানের আবহাওয়া সংস্থার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নির্ণয়ের সময় হিসাবের ত্রুটি হয়েছিল। প্রকৃত উৎপত্তিস্থলের অবস্থান নিয়ে ভুল অনুমানের কারণে ভূমিকম্পটির মাত্রা ৯.৯ নির্ধারণ করা হয়। পরে হিসাব সংশোধন করে প্রকৃত মাত্রা ৬.৯ বলে জানানো হয়।

সংস্থাটির হিসাবে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল প্রকৃত অবস্থানের তুলনায় জাপান থেকে প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার দূরে বলে ভুল ধারণা করা হয়েছিল। এই ভুল অনুমানই প্রাথমিক সতর্কবার্তায় বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়া মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই বার্তায় ভুল তথ্য থাকলে জনমনে অযথা আতঙ্ক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হতে পারে। জাপানের এই ঘটনায় প্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

জনদুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ আবহাওয়া সংস্থার

ভুল সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা। সংস্থাটির কর্মকর্তা শিনিয়া সুকাদা সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনসাধারণের যে ব্যাপক অসুবিধা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

ভুল সতর্কবার্তার কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়লেও সাময়িকভাবে গণপরিবহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। জরুরি সতর্কসংকেত পেয়ে অনেক মানুষ পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে সতর্কবার্তা প্রত্যাহার এবং ভূমিকম্পের প্রকৃত মাত্রা প্রকাশের মাধ্যমে বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ।

জাপানে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। দেশটি নিয়মিত ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এমন ব্যবস্থায় ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে মানুষের আস্থা ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।

২০১১ সালের ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি এখনো তাজা

জাপানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সতর্কতা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করার পেছনে রয়েছে দেশটির অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ২০১১ সালের ১১ মার্চ দেশটির উত্তর-পূর্ব উপকূলে সমুদ্রের তলদেশে ৯.০ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর সৃষ্ট সুনামিতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।

ওই দুর্যোগে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হন অথবা নিখোঁজ হন। সুনামির ঢেউয়ে ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পারমাণবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে জাপানকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।

এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণে ভূমিকম্প ও সুনামির সতর্কবার্তাকে জাপানের মানুষ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে ৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সতর্কতা প্রকাশিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কতটা ভয়াবহ হতে পারত?

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্প ২০১১ সালের জাপানের ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় প্রায় ২২ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করতে পারত। তবে ভূমিকম্পের মাত্রা ও এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সম্পর্ক নির্ভর করে উৎপত্তিস্থলের গভীরতা, অবস্থান, জনবসতি এবং অন্যান্য ভৌগোলিক পরিস্থিতির ওপর।

শুক্রবারের প্রকৃত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৬.৯ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গভীরে। ফলে প্রাথমিক সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা ৯.৯ মাত্রার সঙ্গে প্রকৃত ভূমিকম্পের মাত্রার বড় পার্থক্য ছিল।

ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ধারণে সামান্য পরিবর্তনও শক্তি নির্গমনের হিসাবে বড় পার্থক্য তৈরি করে। তাই ৬.৯ ও ৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের মধ্যে পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; শক্তির বিচারে তা অত্যন্ত ব্যাপক।

দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন

জাপানের এই ঘটনা দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততার পাশাপাশি নির্ভুলতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভূমিকম্পের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সতর্কতা জারি করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য যাচাই ও সংশোধন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের কাছে এমন পরিস্থিতিতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে দ্রুততম সময়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা যায় এবং প্রাথমিক হিসাবের ভুল হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধিত বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। কারণ একটি ভুল সতর্কবার্তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, আবার যথাসময়ে সঠিক সতর্কতা না পৌঁছালেও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ভুল হিসাবের কারণ ব্যাখ্যা করে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে এ ঘটনায় সতর্কবার্তা তৈরির প্রক্রিয়ায় কী ধরনের সংশোধন আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

সব মিলিয়ে, ৯.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সতর্কতা জারির কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা প্রত্যাহারের ঘটনাটি জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ভূমিকম্পপ্রবণ দেশটিতে দ্রুত সতর্কবার্তা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সেই বার্তার যথার্থতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সূত্র: এএফপি

কালের আলো/এএইচ/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন