ভারতের ওপর ১০০% শুল্কের হুমকি স্থগিত করলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৩২ অপরাহ্ণ
রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আপাতত তা স্থগিত করা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের বিধান কার্যকরের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে শুক্রবার ( ১৬ অক্টোবর) রাতে এ সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ছাড় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার বিধান স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়নি। আপাতত সেগুলোর প্রয়োগ স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ট্রাম্প আবারও এসব ব্যবস্থা কার্যকর করার সুযোগ রাখতে পারেন। এতে ভারত ও চীনের ওপর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপ আপাতত কমলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

জাতীয় স্বার্থের কথা বলে সিদ্ধান্ত স্থগিত

শুক্রবার ( ১৬ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানান, সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্কের প্রয়োগ আপাতত মওকুফ করা হচ্ছে। এ ধরনের ছাড় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে—এ মর্মে তিনি কংগ্রেসে একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলেও আদেশে উল্লেখ করেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনে এমন দেশগুলোর ওপর নতুন করে বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। তবে সিদ্ধান্তটি স্থায়ী নয়। পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী ভবিষ্যতে আবারও শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

কী ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনায়?

গত মাসে রাশিয়া ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের একটি আইনে সই করেন ট্রাম্প। আইনটিতে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়।

আইনটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানো। এ জন্য রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিধান রাখা হয়।

আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা হিসেবে চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজানের মতো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা রুশ জ্বালানি পণ্যের ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আইনটির নির্ধারিত এক মাসের সময়সীমা ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই ট্রাম্প শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ স্থগিত করলেন।

ভারতের রপ্তানি খাতে কী প্রভাব পড়তে পারত?

ভারতের ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির রপ্তানি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারত। কারণ, নতুন শুল্কের সঙ্গে আগে থেকে কার্যকর থাকা শুল্ক যুক্ত হলে ভারতীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে পোশাক, শিল্পপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারত। তবে নতুন শুল্ক কার্যকর না হওয়ায় আপাতত সেই তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। গত বছর রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের পাশাপাশি আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত ওই ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয় এবং দুই দেশের বাণিজ্য কাঠামোর অংশ হিসেবে পারস্পরিক শুল্কের হার ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

এ পরিস্থিতিতে নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি কার্যকর হলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কে আবারও চাপ তৈরি হতে পারত। আপাতত সেই আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের অবস্থান

ভারত বারবার জানিয়েছে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রাখার অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

গত মাসে মার্কিন কংগ্রেসে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, নিজেদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত নয়াদিল্লি।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি উঠে এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতের জন্য রাশিয়ার তেল গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন শুল্ক স্থগিত হওয়ায় আপাতত সেই চাপ এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ, ইউক্রেন নিয়ে বাড়ছে টানাপড়েন

রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনাও বাড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

গত সপ্তাহে রাশিয়ার সঙ্গে একটি ডিজেল সরবরাহ চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। পরবর্তী কয়েক মাসেও আরও জ্বালানি পাঠানোর কথা রয়েছে।

এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের জন্য মর্যাদাকর নয় এবং এটি একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও মস্কোর সঙ্গে এমন চুক্তি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতায় পৌঁছাতে জেলেনস্কির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের নতুন নেতা পাওয়ার সময় এসেছে। তিনি ইউক্রেনকে এমন একজন নেতা খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেন, যিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।

স্থগিতাদেশে স্বস্তি, তবে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে

ট্রাম্পের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে ভারত ও চীনের ওপর সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ শুল্কের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি আপাতত কমেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দেশও স্বস্তি পেতে পারে। তবে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার বিধান পুরোপুরি বাতিল না হওয়ায় ভবিষ্যতে আবারও এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাশিয়ার তেল কেনা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির মধ্যে সম্পর্ক এখনো জটিল। ফলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আপাতত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত রেখে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ রাখছে।

আগামী দিনে ওয়াশিংটন, মস্কো ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা কোন দিকে এগোয়, তার ওপর এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে।

কালের আলো/এএইচ/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন