হলুদ কার্ডের বদলে হাতে মোবাইল! ফুটবলে আসছে নতুন প্রযুক্তি

ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:২০ অপরাহ্ণ
ফুটবল মাঠে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর দৃশ্য বহু বছর ধরেই খেলাটির পরিচিত অংশ। কোনো খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে কিংবা মাঠ থেকে বহিষ্কার করতে রেফারির হাতে কার্ড ওঠার মুহূর্তে বদলে যায় ম্যাচের পরিস্থিতি। তবে সেই পরিচিত দৃশ্যেই এবার প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাগজের হলুদ কার্ডের পরিবর্তে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেছেন এক রেফারি। এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

বৃহস্পতিবার (১৫অক্টোবর) উরুগুয়ে কাপের ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের মধ্যকার ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। প্রচলিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে তিনি হাতে থাকা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রিন ব্যবহার করে খেলোয়াড়কে সতর্ক করেন। ভিডিওটি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এটাই কি ফুটবলের ভবিষ্যৎ?

তবে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল কার্ড দেখানোর দৃশ্য বদলে দেওয়া নয়। বরং ম্যাচ চলাকালে রেফারির নেওয়া শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা এবং ম্যাচ শেষে প্রশাসনিক প্রতিবেদন তৈরির কাজ সহজ করাই এর মূল লক্ষ্য।

কেন কাগজের কার্ডের বদলে ডিজিটাল ডিভাইস?

ফুটবলে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সাধারণত সেই সিদ্ধান্তের তথ্য লিখে রাখতে হয়। কোন খেলোয়াড় কার্ড পেয়েছেন, ম্যাচের কত মিনিটে ঘটনাটি ঘটেছে এবং কী কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য ম্যাচের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হয়। পরে এসব তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়।

এই প্রক্রিয়াকে সহজ করতেই ডিজিটাল কার্ডের ধারণা এসেছে। নতুন ডিভাইসটির মাধ্যমে ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা নির্দিষ্ট সময়সহ বা টাইমস্ট্যাম্প দিয়ে রেকর্ড করা যায়। ফলে মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হাতে লিখে তথ্য নথিভুক্ত করা এবং পরে সেগুলো আবার ডিজিটাল সিস্টেমে স্থানান্তরের প্রয়োজন কমতে পারে।

প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফুটবলে একমাত্র যে বিষয়টি এখনো অ্যানালগ রয়েছে, আমরা সেখানে প্রযুক্তি নিয়ে আসতে কাজ করছি।’

অর্থাৎ, ফুটবলের অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও কার্ড দেখানোর পর সংশ্লিষ্ট তথ্য নথিভুক্ত করার প্রচলিত প্রক্রিয়াটি আধুনিকায়নের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন এই প্রকল্পের উদ্যোক্তারা।

তিন বছরেরও বেশি আগে শুরু হয় ভাবনা

ডিজিটাল স্ক্রিনে কার্ড দেখানোর ধারণাটি হঠাৎ করেই আসেনি। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা মাউরো সাকো ও তাঁর সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা তিন বছরেরও বেশি সময় আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, রেফারিরা কেন এখনো হাতে লিখে সতর্কবার্তা ও শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য নথিভুক্ত করেন? পরে সেই তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তর করতে হয় কেন?

এই প্রক্রিয়ার বিকল্প খুঁজতে গিয়েই ডিজিটাল কার্ডের ধারণা সামনে আসে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, রেফারির হাতে এমন একটি ডিভাইস দেওয়া, যা দিয়ে মাঠে সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

নতুন ডিভাইসটি উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন নির্মাতারা। এর ফলে ম্যাচ পরিচালনার পর রেফারিদের প্রশাসনিক কাজের চাপও কমতে পারে।

রেফারির কাছে সুবিধাজনক, কিন্তু হারাচ্ছে কার্ড দেখানোর নাটকীয়তা

পরীক্ষামূলক ডিভাইসটি ব্যবহার করে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। তাঁর কাছে যন্ত্রটি ব্যবহার করা আরামদায়ক মনে হয়েছে এবং এর সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করেছে। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে কার্ড দেখানোর যে দৃশ্যমান নাটকীয়তা রয়েছে, ডিজিটাল স্ক্রিনে তা কিছুটা কমে যায় বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

ভারেলার ভাষায়, ‘দ্রুত কার্ড দেখানোর সেই জাদুকরি ব্যাপারটি কিছুটা হারিয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় এটি আমাদের অনেক সাহায্য করবে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে।’

ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ড শুধু শাস্তির সংকেত নয়, ম্যাচের উত্তেজনা ও নাটকীয়তারও একটি অংশ। রেফারি পকেট থেকে কার্ড বের করে উঁচিয়ে ধরলে খেলোয়াড়, দর্শক ও টেলিভিশনের সামনে থাকা দর্শকেরা তা সহজেই বুঝতে পারেন। কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে একই তথ্য দেখানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ কারণে প্রযুক্তিটি প্রশাসনিক কাজ সহজ করলেও মাঠে কার্ড দেখানোর প্রচলিত অভিজ্ঞতা কতটা অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূর্যের আলোয় স্ক্রিন দেখা নিয়ে সমস্যা

ডিজিটাল কার্ডের পরীক্ষামূলক ব্যবহারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্ক্রিনের দৃশ্যমানতা। এর আগে ডিভাইসটির একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল, কারণ সূর্যের আলোয় স্ক্রিনের তথ্য স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না।

বৃহস্পতিবারের (১৫অক্টোবর) ম্যাচেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ ডিভাইসটির মাধ্যমে রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।

প্রযুক্তিটি সফল করতে হলে রেফারির পাশাপাশি মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছেও কার্ডের রং এবং সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে হবে। বিশেষ করে হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের রং যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা জরুরি, যাতে শাস্তির ধরন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।

প্রকল্পটির সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রকল্প, যাতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। টিভির চেয়ে মাঠে এটি ভালো দেখা গেছে। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সব দর্শকের জন্য এর মান উন্নত করা। হলুদ কার্ডকে হলুদ হতে হবে, লাল কার্ডকে লাল হতে হবে এবং মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।’

দৃশ্যমানতা বাড়াতে যুক্ত হতে পারে এলইডি লাইট

ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়াতে এর নির্মাতারা বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। দর্শকেরা যেন দূর থেকেও কার্ডের রং ও সিদ্ধান্ত সহজে বুঝতে পারেন, সে জন্য ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি লাইটিং যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তিটির উন্নয়নে শুধু স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। মাঠের আলো, সূর্যের অবস্থান, দর্শকের বসার জায়গা এবং টেলিভিশনের ক্যামেরায় দৃশ্যটি কতটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ডিভাইসটির ব্র্যান্ড নিবন্ধিত হয়েছে এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্টও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপারদের ভিত্তি চীনে।

তবে প্রযুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মাঠ ও আলোক পরিস্থিতিতে ডিভাইসটি কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ডিজিটাল কার্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ ফুটবলে প্রযুক্তির আরও বিস্তৃত ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের সহজবোধ্যতা এবং ঐতিহ্য নষ্ট হতে পারে।

ডিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘আমরা নানা ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখেছি। এমনকি আমরা মিম দেখে হেসেছিও। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ এটি নিয়ে কথা বলছে। যেকোনো নতুন উদ্ভাবনেই কিছুটা সময় লাগে।’

প্রযুক্তিটির উদ্যোক্তাদের মতে, নতুন কোনো ব্যবস্থা চালু করতে গেলে শুরুতে প্রশ্ন ও সমালোচনা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এসব প্রতিক্রিয়া থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিয়ে ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

ফিফা ও কনমেবলের স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্য

ডিজিটাল কার্ডের নির্মাতারা ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করে দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করছেন।

তবে এখন পর্যন্ত এটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। ফিফা বা কনমেবল প্রযুক্তিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে—এমন তথ্য নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহারের আগে ডিভাইসটির কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং মাঠ ও টেলিভিশনে দৃশ্যমানতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে ডিজিটাল কার্ড ফুটবলে প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ হতে পারে, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তথ্য আরও নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে প্রচলিত কার্ডের পরিচিত রূপ, তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা এবং ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তিটির সমন্বয় ঘটানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্থায়ী অংশ হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও উন্নয়নের মধ্য দিয়েই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

কালের আলো/এএন/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন