কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য গত জুনে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতার পরও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, আর ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সতর্কতা পাওয়ার পর ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
টয়লেট থেকে উদ্ধার চারজনের মরদেহ
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। আগুনে রিসোর্টের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়। আগুনে দগ্ধদের অবস্থা ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেন।
শর্টসার্কিট না রান্নাঘরের চুলা—আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য
রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দুটি বক্তব্যেই আগুনের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
ধোঁয়ায় অন্ধকার, স্ত্রীকে নিয়ে নালায় লাফ দেন পর্যটক
আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা সেখানে উঠেছিলেন। তাঁদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল। তাঁর বর্ণনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের সামনে তৈরি হওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং অগ্নিকাণ্ডে সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

কক্সবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:০৮ অপরাহ্ণ