মায়ের ছাগল বিক্রির টাকায় কেনা ফোন, সেই ছেলেই এখন জাপানে মাইক্রোসফটে

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:০১ অপরাহ্ণ

আমেরিকা বাংলা ডেস্ক: ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটি মোবাইল ফোন কেনার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের। ছেলের শেখার আগ্রহ দেখে মা একটি ছাগল বিক্রি করে সেই ফোন কিনে দিয়েছিলেন। সেই ফোনকে মডেম হিসেবে ব্যবহার করেই প্রযুক্তির জগতে প্রবেশের পথ খুঁজে নেন কুষ্টিয়ার তরুণ মো. নাসিম আল আওয়াল। দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আজ তিনি জাপানে মাইক্রোসফটের ক্লাউড অবকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কাজে যুক্ত হয়েছেন।

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত তাঁর সাফল্যের গল্পটি দেখিয়েছে, সীমিত সুযোগের মধ্যেও শেখার আগ্রহ ও ধারাবাহিক চেষ্টা একজন মানুষকে কত দূর এগিয়ে নিতে পারে।

ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ

কুষ্টিয়ার আমলা-সদরপুর এলাকার নাসিমের ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্রতি ছিল গভীর কৌতূহল। পরিচিতদের মোবাইল ফোন কিংবা টেলিভিশনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন তিনি। এই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাঁকে প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনের পথে এগিয়ে দেয়।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ডিনেটের কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে কম্পিউটার শেখার সুযোগ পান নাসিম। পরে ভর্তি হন কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার প্রযুক্তি বিভাগে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

মায়ের কিনে দেওয়া ফোনেই শুরু প্রযুক্তি শেখা

নাসিমের শেখার পথে বড় সহায়তা হয়ে আসে মায়ের বিক্রি করা ছাগলের টাকায় কেনা মোবাইল ফোনটি। ওই ফোনকে মডেম হিসেবে ব্যবহার করে ইন্টারনেটে যুক্ত হতেন তিনি। অনলাইনে প্রযুক্তিবিষয়ক ভিডিও দেখতেন, বিভিন্ন ফোরামে প্রশ্ন করতেন এবং নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতেন।

প্রযুক্তি শেখার জন্য তখন তাঁর হাতে ছিল না দামি কম্পিউটার কিংবা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। কিন্তু সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই চর্চাই তাঁর দক্ষতা ও পেশাগত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

ডিনেটে কাজ, হাজারো শিক্ষকের সঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে অভিজ্ঞতা

২০১২ সালে ডিনেটে প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন নাসিম। পরে প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ও সহকারী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় দেশের প্রায় ৩৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনেই সাহায্য করেনি, বরং বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করা, সমস্যা সমাধান এবং দায়িত্ব পালনের দক্ষতাও বাড়িয়েছে।

জাপানে গিয়ে প্রথমে কাজ করেন গাড়ির কারখানায়

২০১৮ সালের শেষ দিকে জাপানে পাড়ি জমান নাসিম। তবে বিদেশে পা রেখেই প্রযুক্তি খাতে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি তিনি। প্রথমে নাগোয়ার একটি গাড়ি কারখানার উৎপাদন লাইনে কাজ শুরু করেন। নতুন দেশ, ভাষা ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও চালিয়ে যান।

পরিশ্রমের পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ভাষাগত সক্ষমতা উন্নত করার চেষ্টা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সুযোগ পেলে নিজের শেখা বিষয়গুলো বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো।

এনটিটি কমিউনিকেশনসে নতুন অধ্যায়

২০২০ সালের মে মাসে নাসিম জাপানের এনটিটি কমিউনিকেশনসে নেটওয়ার্ক অপারেশনস সেন্টার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে সাবমেরিন কেবলের সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত সহায়তাসংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক পরিচালনা, সমস্যা শনাক্তকরণ এবং প্রযুক্তিগত সেবা দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নাসিম।

একবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও থামেননি

বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার স্বপ্ন পূরণে একাধিকবার আবেদন করেছিলেন নাসিম। কিন্তু সব আবেদনেই সফলতা আসেনি। ২০২২ সালে মাইক্রোসফটে আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন তিনি।

তবে সেই ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখেননি। বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন। নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করা, প্রয়োজনীয় বিষয়ে শেখা এবং পরবর্তী সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকার ওপর জোর দেন।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নাসিম মাইক্রোসফট জাপানের ক্লাউড অপারেশনস অ্যান্ড ইনোভেশনস দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে ক্লাউড অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন তিনি।

‘আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু হাল ছাড়িনি’

নিজের অর্জন সম্পর্কে নাসিমের বক্তব্য, ‘আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু হাল ছাড়িনি।’

তাঁর এই বক্তব্য সাফল্যের পেছনে ধারাবাহিক চেষ্টা ও শেখার মানসিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে। সবকিছু অনুকূলে না থাকলেও নিজের লক্ষ্য ধরে রেখে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান নাসিম। বিশেষ করে চাকরির আবেদনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর হতাশ না হয়ে কীভাবে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হয়, সে বিষয়ে তরুণদের উৎসাহিত করতে আগ্রহী তিনি।

সংগ্রাম থেকে সাফল্য, তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা

নাসিম আল আওয়ালের পথচলা শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, শেখার আগ্রহ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং বারবার ব্যর্থতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গল্প।

মায়ের বিক্রি করা ছাগলের টাকায় কেনা একটি ফোন তাঁর প্রযুক্তি শেখার যাত্রার সূচনা করেছিল। সেই যাত্রা তাঁকে নিয়ে গেছে জাপানের প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কর্মপরিবেশে। তাঁর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের তরুণদের মনে করিয়ে দেয়, সুযোগের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হতে পারে, কিন্তু শেখার আগ্রহ ও ধারাবাহিক প্রস্তুতি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

কালের আলো/এএন/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন