২০১৬ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ড হাঙরের বয়স নির্ধারণের চেষ্টা করেন। তাঁদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় স্ত্রী হাঙরটির বয়স আনুমানিক ৩৯২ বছর বলে অনুমান করা হয়। তবে এই বয়স নির্দিষ্টভাবে গণনা করা হয়নি; বরং বৈজ্ঞানিক পরিমাপের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাণীটির বয়স কয়েক শতাব্দী হতে পারে।
চোখের লেন্সের প্রোটিনে লুকিয়ে ছিল বয়সের রহস্য
গ্রিনল্যান্ড হাঙরের বয়স নির্ধারণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যান্য অনেক মাছের মতো এদের শরীরে বয়স নির্ধারণের উপযোগী স্পষ্ট বৃদ্ধিবলয় পাওয়া যায় না। তাই গবেষকেরা বেছে নেন ভিন্ন একটি পদ্ধতি।
হাঙরের চোখের লেন্সের কেন্দ্রীয় অংশে থাকা প্রোটিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এসব প্রোটিন প্রাণীর জীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই তৈরি হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত থাকে। প্রোটিনে থাকা কার্বনের সংকেত বিশ্লেষণ করে হাঙরগুলোর আনুমানিক বয়স নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।
গবেষণায় সবচেয়ে বড় হাঙরটির বয়স প্রায় ৩৯২ বছর বলে অনুমান করা হলেও বিজ্ঞানীরা এর বয়সের একটি বিস্তৃত সম্ভাব্য সীমাও উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, প্রাণীটির প্রকৃত বয়স ৩৯২ বছরই—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ফলাফলটি ইঙ্গিত দেয়, গ্রিনল্যান্ড হাঙর কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
শীতল সমুদ্রেই দীর্ঘজীবনের রহস্য
গ্রিনল্যান্ড হাঙর মূলত উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের গভীর, ঠান্ডা পানিতে বসবাস করে। এদের অনেককে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক শ মিটার, এমনকি দুই হাজার মিটারেরও বেশি গভীরতায় দেখা যায়।
এই হাঙর অত্যন্ত ধীরগতিতে সাঁতার কাটে এবং এর বিপাকক্রিয়াও ধীর। ঠান্ডা পরিবেশ ও ধীর শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ এদের দীর্ঘ জীবনকালের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ঠিক কোন কোন জৈবিক প্রক্রিয়া এদের এত দীর্ঘজীবী করে তোলে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
প্রজননক্ষম হতে লাগতে পারে দেড় শতাব্দী
গ্রিনল্যান্ড হাঙরের জীবনচক্রের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর ধীরগতির শারীরিক পরিপক্বতা। গবেষকদের অনুমান, স্ত্রী গ্রিনল্যান্ড হাঙর প্রজননক্ষম হতে প্রায় ১৫০ বছর সময় নিতে পারে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে ওঠার অর্থ হলো, এদের সংখ্যা কমে গেলে সেই ক্ষতি পূরণ হতে বহু প্রজন্ম সময় লাগতে পারে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, অনিচ্ছাকৃতভাবে মাছ ধরার জালে আটকে পড়া এবং সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন এদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মানবসভ্যতার পরিবর্তনের সাক্ষী সমুদ্রের এই বাসিন্দা
গবেষণায় অনুমান করা বয়স অনুযায়ী, কোনো গ্রিনল্যান্ড হাঙর যদি প্রায় ১৬২০ সালের দিকে জন্ম নিয়ে থাকে, তাহলে তার জীবনকালে পৃথিবীতে ঘটে গেছে অসংখ্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা, শিল্পবিপ্লব এবং উড়োজাহাজের আবিষ্কারের মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে তার সম্ভাব্য জন্মের বহু পরে।
অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো হাঙর এসব ঘটনার সময় থেকে আজ পর্যন্ত বেঁচে আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বয়স নির্ধারণের গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, এই প্রজাতির কিছু সদস্যের জীবনকাল মানুষের সাধারণ ধারণার তুলনায় অনেক দীর্ঘ হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রিনল্যান্ড হাঙর তাই শুধু দীর্ঘজীবী একটি সামুদ্রিক প্রাণী নয়; বরং প্রাণীর বার্ধক্য, দীর্ঘায়ু ও গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে এদের ধীর প্রজনন ও দীর্ঘ জীবনকাল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।
কালের আলো/জেএন/এসএ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:১০ অপরাহ্ণ