পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি বন্ধ ও প্রত্যাহার করতে ইসরায়েলকে চীনের আহ্বান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক , কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:২২ অপরাহ্ণ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি স্থাপন বন্ধ এবং ইতোমধ্যে গড়ে তোলা বসতি প্রত্যাহার করতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন সংকটকে চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি গাজায় অবিলম্বে ও পূর্ণাঙ্গভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন চীনের এই শীর্ষ কূটনীতিক।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে ওয়াং ইর এসব বক্তব্যের কথা জানানো হয়। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের সঙ্গে বৈঠকে তিনি পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিন সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে টাইমস অব ইসরায়েল।

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে এবং ইতোমধ্যে নির্মিত বসতিগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

ওয়াং ইর বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নে চীনের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বেইজিং মনে করে, ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তাই সংঘাতের সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্যোগ, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমাধানের পথে এগোনোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

‘ফিলিস্তিন সংকট চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার’
বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, ফিলিস্তিন সংকটকে চীন চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে বিবেচনা করে। তাঁর মতে, এই সংকটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার ও দাবির বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ওয়াং ইর বক্তব্যে সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। বেইজিংয়ের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসানে এমন একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন, যেখানে উভয় পক্ষের মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চীনও এই অবস্থানের পক্ষে নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানেই সংকটের অবসান দেখছে বেইজিং
ওয়াং ই বলেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সংকটের সঠিক সমাধান সম্ভব। এই নীতির আওতায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করবে—এমন ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে চীন।

বেইজিংয়ের অবস্থান অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টি রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তবে এ ধরনের সমাধান বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং সংঘাতের মূল কারণগুলো মোকাবিলা করেই স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে হবে।

গাজায় অবিলম্বে মানবিক সহায়তা প্রবেশের তাগিদ
ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে আলোচনায় গাজার মানবিক পরিস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরেন ওয়াং ই। তিনি গাজায় অবিলম্বে ও পূর্ণাঙ্গভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন, যাতে মানবিক বিপর্যয় আরও বিস্তৃত না হয়।

গাজায় সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষের জীবন, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা মানবিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ।

ওয়াং ইর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ বাধামুক্ত রাখা এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক আলোচনাও এগিয়ে নিতে হবে।

সংলাপ ও আলোচনায় ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায় চীন
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সব পক্ষকে যত দ্রুত সম্ভব সংলাপ ও আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং। চীনের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে।

বেইজিংয়ের মতে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। চীন দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। ওয়াং ইর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থান আবারও তুলে ধরা হয়েছে।

বাকুতে হেরজগের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত সম্মেলন—সিআইসিএর ফাঁকে দুই নেতার বৈঠক হয়। সেখানে চীন ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

তবে পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে দুই নেতার আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে হেরজগের কার্যালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বৈঠকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে বা এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত চীনের
এদিকে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিনের সঙ্গে বৈঠকেও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন ওয়াং ই। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনের অধিকার ও দাবির পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখবে বেইজিং। ওয়াং ই বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যুকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে শান্তিপ্রিয় সব দেশকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধ, গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের অবসান—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে চীন। তবে এসব আহ্বানের পর ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

কালের আলো/এএএন/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন