মিথ্যা সংবাদ ও পোস্টের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ চান শফিকুল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৫১ অপরাহ্ণ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ এবং ব্যক্তির চরিত্রহননের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব ও দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম। মিথ্যা সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা পোস্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষায় মানহানি আইন কার্যকর করা এবং দেওয়ানি আইনের আওতায় জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিষয়ে মিডিয়া কমিটি ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুল আলম বলেন, বিদ্যমান আইন অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে পারছে না। বর্তমানে মতপ্রকাশের বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা অনেক সময় বড় সংবাদমাধ্যমের চেয়েও বেশি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কখনো কখনো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়।

তিনি বলেন, মানুষ রাগ, ক্ষোভ কিংবা বিভিন্ন মতামত প্রকাশে ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সময় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক চিন্তাভাবনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

মানহানি আইন কার্যকরের তাগিদ

শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে মানহানিসংক্রান্ত যে আইন রয়েছে, তা কার্যকর করা উচিত। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে আইনটি থাকলেও এর আওতায় কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করছেন।

তিনি বলেন, দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই—এমন দাবি করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেটে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের ঘটনা দেখা যায়। কেউ নিজের নাম দিয়ে অনলাইনে অনুসন্ধান করলে তাঁর বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা সংবাদ পেতে পারেন। এসব তথ্য তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও দেখতে হতে পারে।

শফিকুল আলমের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে ঘটছে না; ক্লিকবেটের কারণে সংবাদপত্রও অনেক সময় এ ধরনের কাজ করছে। এসব সমস্যা প্রচলিত আইন দিয়ে মোকাবিলা করা হবে, নাকি সাইবার আইনের মাধ্যমে—তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, প্রচলিত মানহানি আইনে মামলা হলে তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতের রায় চাইলেও তাঁর ক্ষতির দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়।

‘মিথ্যা সংবাদে ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা কে দেবে’

শফিকুল আলম বলেন, খারাপ সাংবাদিকতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা পোস্টের কারণে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁদের সুরক্ষা কে দেবে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা এসব ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে মানহানির বিষয়টি দেওয়ানি আইনের আওতায় মোকাবিলার যে ব্যবস্থা রয়েছে, বাংলাদেশেও সে ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে দেওয়ানি আইনের আওতায় প্রতিকার নিশ্চিত করার পক্ষে মত দেন। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে অন্যের চরিত্রহনন করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শফিকুল আলমের মতে, কোনো সংবাদমাধ্যম মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করে কারও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করলে তার দায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যে সংবাদপত্রগুলোর মামলা হারলে জরিমানা দেওয়ার জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনার কথা বলেন।

‘ফ্রি স্পিচের নামে ওয়াইল্ড ওয়েস্ট তৈরি হচ্ছে’

শফিকুল আলম বলেন, কেউ ভুলবশত কোনো তথ্য প্রকাশ করেছেন, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছেন—তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে কারও সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি সরকারি চুক্তি না পাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব বা যুগ্ম সচিবের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। অথচ এ ধরনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

তাঁর মতে, মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নিতে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলতে পারেন। তবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের পরিণতি নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ১৮ মাস কাজ করার সময় তিনি এসব বিষয় কাছ থেকে দেখেছেন উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, ভবিষ্যতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ইন্টারনেটে থেকে যায় মিথ্যা সংবাদ

শফিকুল আলম বলেন, ইন্টারনেটে প্রকাশিত তথ্য শুধু তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না, বরং দীর্ঘদিন থেকে যায়। কেউ জনজীবন থেকে সরে গেলেও তাঁর নাম দিয়ে অনলাইনে অনুসন্ধান করলে পুরোনো নেতিবাচক বা মিথ্যা প্রতিবেদন সামনে আসতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তিনি বলেন, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।

নিজেকে একজন সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, তিনি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চান। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে মানুষকে সত্য বলতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি মানহানি আইন কার্যকর করা এবং দেওয়ানি আইনের আওতায় যথাযথভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন