ওয়ানডে ক্রিকেটে আইসিসির নতুন বল ব্যবহারের নিয়ম বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বলের সুইং বাড়লেও পেসাররা সেই সুবিধাকে উইকেট কিংবা রান আটকে রাখার সাফল্যে রূপ দিতে পারছেন না। অন্যদিকে ইনিংসের শেষ দিকে প্রতিপক্ষের বোলারদের রিভার্স সুইং সামলাতে গিয়ে রান তোলার গতি হারাচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। একই নিয়মে অন্য দলগুলো যেখানে নিজেদের কৌশল বদলে সাফল্য পাচ্ছে, সেখানে দুই বিভাগেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারে স্পষ্ট দুর্বলতা
এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেছে শনিবার (১৭ অক্টোবর) আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে। প্রথমে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৭১ রান তোলে জিম্বাবুয়ে। জবাবে বাংলাদেশের ইনিংস ৩৪ ওভারের মধ্যেই গুটিয়ে যায় ১৭২ রানে। ফলে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারতে হয় বাংলাদেশকে।
ম্যাচ শেষে তাসকিন আহমেদও ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে হারের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, বোলিংয়ে কিছুটা ধারাবাহিকতা দেখা গেলেও ব্যাটিংয়ে নিয়মিত ভুল করছে দল।
তবে ম্যাচের পরিসংখ্যান বলছে, বোলিংয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। তাসকিন ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিলেও তাঁর পারফরম্যান্সের চিত্র ছিল দুই রকম। নতুন বলে প্রথম ৬ ওভারে ২ মেডেনসহ মাত্র ১৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন তিনি। কিন্তু শেষ দিকে নিজের করা দুই ওভারে দেন ১৯ রান, পাননি কোনো উইকেট।
একই ম্যাচে মোস্তাফিজুর রহমানও ডেথ ওভারে তিন ওভার বল করে ২৪ রান দেন, উইকেট পাননি একটিও। অথচ শেষ দিকে প্রতিপক্ষের রান আটকে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা ছিল।
নতুন নিয়মে কেন বাড়ছে রিভার্স সুইং
গত বছরের জুলাইয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে সাদা বল ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন আনে আইসিসি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইনিংসের প্রথম ৩৪ ওভারে দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বল ব্যবহার করা হয়। এরপর অধিনায়ক দুটি বলের মধ্যে একটি বেছে নেন। বাকি ১৬ ওভার খেলা হয় সেই বল দিয়ে।
সাধারণত অধিনায়কেরা এ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পুরোনো ও খসখসে বল বেছে নেন। কারণ, এমন বল রিভার্স সুইং করানোর জন্য বেশি উপযোগী। ফলে ইনিংসের শেষ দিকে পেসারদের বলের গতিপথ পরিবর্তনের সুযোগ বাড়ছে এবং ব্যাটসম্যানদের জন্য শট খেলা কঠিন হয়ে উঠছে।
ক্রিকেট পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী সংস্থা ক্রিকভিজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিয়ম পরিবর্তনের পর ওয়ানডেতে ডেথ ওভারে রিভার্স সুইংয়ের প্রভাব বেড়েছে। তবে শুধু সুইং বাড়লেই বোলারদের সাফল্য নিশ্চিত হচ্ছে না। সেই সুইং কাজে লাগিয়ে কীভাবে উইকেট নিতে হবে এবং রান আটকে রাখতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সুইং বেড়েছে মোস্তাফিজ–তাসকিনের, কিন্তু কমেনি রান খরচ
নতুন নিয়ম চালুর পর ডেথ ওভারে বলের সুইং সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, এমন পেসারদের তালিকার প্রথম চারজনের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদ। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়তি সুইং প্রত্যাশিত সাফল্য নিয়ে আসেনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেথ ওভারে মোস্তাফিজের বলের সুইং বেড়েছে ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ তাঁর বোলিং গড় বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে ০ দশমিক ৯। অর্থাৎ বল বেশি সুইং করলেও উইকেট পেতে তাঁকে আগের তুলনায় বেশি রান খরচ করতে হচ্ছে।
তাসকিনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তাঁর বলের সুইং বেড়েছে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বোলিং গড় বেড়েছে ১ দশমিক ৯ এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে ১ দশমিক ৬।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলজারি জোসেফের বলের সুইং বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তাঁর বোলিং গড় কমেছে ৬ দশমিক ৭, যদিও ইকোনমি অপরিবর্তিত রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডির সুইং বেড়েছে ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তাঁর বোলিং গড় কমেছে ১০ দশমিক ৬ এবং ইকোনমি রেট কমেছে ৩ দশমিক ৩।
কম সুইংয়েও সাফল্য পাচ্ছেন অন্য পেসাররা
শুধু বেশি সুইং করাতে পারাই যে সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়, তার আরেকটি উদাহরণ পাকিস্তানের নাসিম শাহ। তাঁর বলের সুইং বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, যা মোস্তাফিজ ও তাসকিনের তুলনায় কম। অথচ তাঁর বোলিং গড় কমেছে ১৯ দশমিক ২ এবং ইকোনমি রেট কমেছে ১ দশমিক ৬।
অস্ট্রেলিয়ার নাথান এলিসের পরিসংখ্যানও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বলের সুইং ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ কমলেও বোলিং গড় কমেছে ৬১, আর ইকোনমি রেট অপরিবর্তিত রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, সুইংয়ের পরিমাণই বোলিংয়ের সাফল্য নির্ধারণ করে না। বলের গতিপথের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে সঠিক জায়গায় বল করা, ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বুঝে পরিকল্পনা সাজানো এবং চাপের মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পেসারদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ বাড়তি সুইংকে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করা।
ব্যাটিংয়ের শেষ ১০ ওভারে বড় পতন
বোলিংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েও নতুন নিয়মের প্রভাব উদ্বেগজনক। ওয়ানডে ইনিংসের শেষ ১০ ওভার সাধারণত দ্রুত রান তোলার গুরুত্বপূর্ণ সময়। হাতে উইকেট থাকলে ব্যাটসম্যানরা এ সময় বড় শট খেলে দলের সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পুরোনো বলের রিভার্স সুইং ও শেষ মুহূর্তের মুভমেন্ট সেই কাজ কঠিন করে তুলছে।
নতুন নিয়ম চালুর আগে ডেথ ওভারে বাংলাদেশের রানরেট ছিল ৭ দশমিক ৮৪। অর্থাৎ শেষ ১০ ওভারে গড়ে প্রায় ৭৮ রান তুলত দলটি। নিয়ম পরিবর্তনের পর সেই রানরেট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৬-তে। এখন শেষ ১০ ওভারে গড়ে প্রায় ৬৬ রান তুলছে বাংলাদেশ। ওভারপ্রতি রান তোলার হার কমেছে ১ দশমিক ২৮।
বাংলাদেশের মতো পাওয়ার হিটিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলের জন্য এই পতন বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। শেষ দিকে রান বাড়াতে না পারলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ গড়া যেমন কঠিন হয়, তেমনি রান তাড়ার সময়ও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
ভারত-ইংল্যান্ড এগিয়েছে, পিছিয়েছে বাংলাদেশ
নতুন নিয়মে সব দলই যে সমস্যায় পড়েছে, তা নয়। ডেথ ওভারে রানরেট সবচেয়ে বেশি কমেছে—এমন দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পতন হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানরেট ১০ দশমিক ৩১ থেকে কমে ৭ দশমিক ৯২ হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের কমেছে ১ দশমিক ৬৮ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১ দশমিক ৪৭।
অন্যদিকে ভারত ও ইংল্যান্ড এই পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার নজির দেখিয়েছে। ভারতের ডেথ ওভারের রানরেট ৬ দশমিক ৯৯ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩৩ হয়েছে। অর্থাৎ ওভারপ্রতি ১ দশমিক ৩৪ রান বেশি তুলছে তারা। ইংল্যান্ডের রানরেটও ৮ দশমিক ০৭ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ১৬ হয়েছে।
এই ব্যবধান দেখিয়ে দিচ্ছে, নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যাটিং কৌশলে পরিবর্তন আনা কতটা জরুরি। শেষ ১০ ওভারে আগের মতো শুধু বড় শটের ওপর নির্ভর না করে স্ট্রাইক বদল, উইকেটের সদ্ব্যবহার এবং ইনিংসের আগের অংশে রান তোলার গতি বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
২০২৭ বিশ্বকাপের আগে বড় পরীক্ষা
আগামী বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। হাতে প্রায় এক বছর সময় থাকলেও নতুন বলের নিয়মের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য এখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে ইনিংসের শেষ দিকে বলের মুভমেন্ট ও বাউন্স ব্যাটসম্যানদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে ডেথ ওভারে ওভারপ্রতি গড় রান ছিল ৭ দশমিক ৩৫। তবে নতুন নিয়মে রিভার্স সুইং আরও কার্যকর হয়ে উঠলে এই চিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশ্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নিয়ম পরিবর্তনের পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে মাত্র তিনটি ওয়ানডে হয়েছে। তাই বিশ্বকাপে নতুন নিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কন্ডিশন ও বলের আচরণ বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য জরুরি।
কীভাবে কাটবে বাংলাদেশের এই ধাঁধা?
বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে মোস্তাফিজ ও তাসকিনদের মতো পেসারদের বাড়তি সুইং কাজে লাগিয়ে উইকেট নেওয়া এবং রান আটকে রাখার দক্ষতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে ব্যাটসম্যানদের পুরোনো বলের রিভার্স সুইং সামলে শেষ দিকে রান তোলার নতুন কৌশল আয়ত্ত করতে হবে।
প্রয়োজনে শেষ ১০ ওভারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ২০ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যেই রান তোলার গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি ডেথ ওভারের বোলিংয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ইয়র্কার ও ভিন্ন গতির বলের কার্যকর ব্যবহার এবং চাপের মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অনুশীলনও বাড়াতে হবে।
২০২৭ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের হাতে সময় রয়েছে। কিন্তু নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক অনুশীলন জরুরি। বাড়তি সুইংকে সাফল্যে রূপান্তর এবং শেষ দিকে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটাতে না পারলে বিশ্বকাপের মঞ্চে এই সমস্যাগুলো আরও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।
কালের আলো/জেএন/এসএ

ক্রীড়া ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:২০ অপরাহ্ণ