কুড়িগ্রামের উলিপুরে দুর্গাপূজার উৎসব চললেও আনন্দ নেই দুই শতাধিক দুঃস্থ রবিদাস পরিবারের ঘরে। আর্থিক সংকটের কারণে সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারেননি অনেক অভিভাবক। নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে উৎসবের কেনাকাটা তাদের কাছে যেন বিলাসিতা। অন্যান্য বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে কিছু সহায়তা পেলেও এবার তা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন এসব পরিবারের সদস্যরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৮০০ রবিদাস পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে দুই শতাধিক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব পরিবার চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। চলতি দুর্গোৎসবেও কোনো সহায়তা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ নেই।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার পৌরসভার তেঁতুলতলা এলাকায় রবিদাস সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গাপূজা ঘিরে অন্যদের মধ্যে উৎসবের আবহ থাকলেও এসব পরিবারের জীবনে তার ছোঁয়া নেই। অভাবের কারণে নতুন পোশাক কেনা তো দূরের কথা, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ভুলুয়া রবিদাস (৬৩) বলেন, ‘উৎসব শুরু হলেও আমাদের মতো পরিবারগুলোর মধ্যে আনন্দ নেই। অতি কষ্টে দিনযাপন করার কারণে ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। আমাদের ব্যবসা প্রায় অচল। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাই। বছরের অন্যান্য দিনগুলো যেমন, পূজার দিনগুলোও আমাদের কাছে তেমন। আমরা সবসময় সমাজে অবহেলিত। অন্যান্য বছর প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করলেও এবার কোনো সহযোগিতা পাইনি।’
জোসনা রবিদাস (৫৫) বলেন, ‘পূজা উপলক্ষে কোনো নতুন কাপড় কেনা হয়নি। তিনবেলা পেট ভরে খাওয়াই কষ্টকর। সেখানে আবার পূজার কী আছে! আজ পূজার দ্বিতীয় দিন চললেও আমাদের ঘরে আনন্দ নেই।’
ধামশ্রেনী ইউনিয়নের ইন্দারার পাড় এলাকার চৈতা রবিদাস (৭৭), বজরা ইউনিয়নের বাবুর হাট এলাকার কার্তিক রবিদাসসহ অনেকে একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তাদের ভাষ্য, বছরে একবার পূজার আনন্দ এলেও অর্থের অভাবে তারা সেই আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এবার সহায়তা না পাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
উপজেলা রবিদাস সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক অনিল রবিদাস বলেন, ‘অন্যান্য বছর সরকারি ভাবে আমরা চাল, কাপড়, ধুতি ও লুঙ্গি পেলেও এবার কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাদের সম্প্রদায়ের অনেক দরিদ্র পরিবার আছে, তারা খুবই কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছে। দুর্গাপূজায় কোনো ধরনের সহযোগিতা পেলে পরিবারগুলো উপকৃত হতো।’
এ বিষয়ে উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (পিআইও) খন্দকার মো. ফিজানুর রহমান জানান, রবিদাস সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি কোনো পৃথক বরাদ্দ নেই। অন্যান্য বছর পূজা উপলক্ষে এ সম্প্রদায়ের মানুষ সরকারি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুঃস্থ রবিদাস পরিবারের মধ্যে কাপড় বিতরণ করবেন বলে তিনি শুনেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.টি.এম. আরিফ জানান, রবিদাস সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে যারা দুঃস্থ, তাদের সহায়তা করা হবে।
উৎসবের এই সময়ে নতুন পোশাক কিংবা বিশেষ খাবারের আনন্দ থেকে বঞ্চিত এসব পরিবারের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের পাশে দাঁড়াবে। দুর্গাপূজার আনন্দ যেন কেবল সচ্ছল মানুষের ঘরেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং অসহায় পরিবারগুলোর জীবনেও পৌঁছায়—এমনটাই তাদের চাওয়া।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ