এক বিসিএসে সরকারি চাকরি করছেন, আরেক বিসিএসেও পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে সুপারিশ। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো পূরণ হবে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও নিয়োগের গেজেটে নাম নেই। কেন বাদ পড়লেন, তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এক রাতেই যেন বদলে গেল সব হিসাব। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন দুই সরকারি কর্মকর্তা—নুরে আলম ও মো. ইফতেখারুল ইসলাম। নুরে আলম ৪৪তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বর্তমানে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারেও সুপারিশ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর দেখেন, সেখানে তাঁর নাম নেই।
অন্যদিকে, ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বর্তমানে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইফতেখারুল ইসলাম। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই সহকারী সার্জন ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারেও চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই নিয়োগের প্রজ্ঞাপনেও ঠাঁই হয়নি তাঁর।
- এক কর্মকর্তা আনসার ক্যাডারে, অন্যজন স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মরত
- চূড়ান্ত সুপারিশের পরও গেজেটে নাম নেই দুই কর্মকর্তার
- নিয়োগের স্বচ্ছতা ও যাচাইব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গত ১৪ অক্টোবর ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল ও নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর নিজেদের বাদ পড়ার বিষয়টি জানতে পারেন তাঁরা। এরপর থেকেই প্রশ্ন—চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কেন তাঁদের নিয়োগ হলো না? যাচাই-বাছাইয়ে কী এমন তথ্য পাওয়া গেল, যার কারণে দুই কর্মকর্তার নাম গেজেট থেকে বাদ পড়ল? প্রকাশিত তথ্যে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। দুই কর্মকর্তার দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে যাচাই-বাছাই করা হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক তথ্য থাকার কথা জানানো হয়নি। তাঁদের ধারণা, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাইয়ের পর্যায়েই আটকে গেছে নিয়োগ। তবে তাঁদের বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
সুপারিশ পেয়েও ১০৫ জনের নিয়োগ নেই
৪৫তম বিসিএসে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ১ হাজার ৮০৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। কিন্তু নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে দেখা যায়, নিয়োগ পেয়েছেন ১ হাজার ৭০২ জন। অর্থাৎ সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০৫ জন শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পাননি অথবা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে কারও নিয়োগ আটকে গেল, কারও নাম গেজেটে এল না, আর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর সামনে আসেনি।
নুরে আলম ও ইফতেখারুল ইসলামের ঘটনা বিতর্কটিকে আরও তীব্র করেছে। কারণ, তাঁরা দুজনই অন্য বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। একজন আনসার ক্যাডারে, অন্যজন স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মরত। অথচ আরেকটি বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও তাঁরা নিয়োগ পাননি। তাঁদের ক্ষেত্রে যাচাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল, কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আগের চাকরিতে নিয়োগের সময় যাচাইয়ের সঙ্গে পরবর্তী যাচাইয়ের কোনো পার্থক্য ছিল কি না—এসব বিষয় পরিষ্কার না হলে বিতর্কের অবসান কঠিন।
নিয়োগের শেষ ধাপে অদৃশ্য বাধা?
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির আগে পুলিশি যাচাই দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রক্রিয়া। নির্ধারিত ফরমে প্রার্থীর দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মামলা রয়েছে কি না, কখনো গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়েছেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। নজরবন্দী থাকা কিংবা কোনো স্থান থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা থাকলেও তার তারিখসহ বিস্তারিত বিবরণ যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।
এর বাইরে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেও প্রার্থী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের ভিত্তিতেও নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এই পর্যায়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসায় অনেক প্রার্থীর নিয়োগ আটকে যায়। কিন্তু যাচাইয়ের প্রতিবেদনই যদি কারও চাকরির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তাহলে সেই প্রতিবেদনের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
কোনো ভুল তথ্যের কারণে একজন যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়লে তার দায় কে নেবে? আর প্রার্থী কীভাবে জানবেন, ঠিক কোন কারণে তাঁর নিয়োগ আটকে গেছে? নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, পরীক্ষার সব ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও যদি একজন প্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
শিক্ষক নিয়োগেও বাদ, পরে প্রায় সবাই নিয়োগ
এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও যাচাই-বাছাইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই নিয়োগে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রথম ধাপেই ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি প্রার্থীকে ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে বাদ পড়া প্রার্থীদের প্রায় সবাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেরাই চাকরিতে যোগ দেননি।
এই ঘটনা যাচাইব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—প্রথম দফায় যাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের প্রায় সবাইকে পরে নিয়োগ দেওয়ার পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? যাচাই-বাছাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় যদি প্রথম সিদ্ধান্তের পর এত বড় পরিবর্তন আসতে পারে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন কি না, সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
‘ভুল হতে পারে, আবার যাচাইয়ের সুযোগ আছে’
৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও গেজেটে নাম না থাকা দুই কর্মকর্তার বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তাঁদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁর ভাষ্য, যাচাইয়ের প্রতিবেদন পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাই তৈরি করে; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজে তা করে না। কেউ আপিল করলে তাঁর বিষয়ে পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। প্রয়োজনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্থার মাধ্যমেও তথ্য যাচাই করা হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ভুল হওয়া অসম্ভব নয়।
তবে পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ থাকার কথা আর সেই সুযোগ বাস্তবে সহজে পাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। বাদ পড়া প্রার্থী কীভাবে আপিল করবেন, কত দিনের মধ্যে করবেন, কোন কর্তৃপক্ষ তাঁর আবেদন নিষ্পত্তি করবে এবং কত দিনে সিদ্ধান্ত জানানো হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো প্রার্থীকে নিয়োগের অযোগ্য বিবেচনা করা হলে তাঁকে কি সেই সিদ্ধান্তের কারণ জানানো হয়? নিজের বক্তব্য তুলে ধরা বা ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ কি তিনি পান?
নুরে আলমের আক্ষেপ: ‘আমার পুরো ক্যারিয়ার এলোমেলো হয়ে গেছে’
কুমিল্লার বাসিন্দা নুরে আলম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ৪৪তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তার আনসার ক্যাডারের মৌলিক প্রশিক্ষণও চলছিল। কিন্তু তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পুলিশে কাজ করা। সেই লক্ষ্য নিয়েই ৪৫তম বিসিএসে অংশ নেন। পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পর নতুন করে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গেজেটে নিজের নাম না পেয়ে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
নুরে আলম বলেন, ‘আমার পুরো ক্যারিয়ারটা এলোমেলো হয়ে গেছে। আনসার ক্যাডারে আমার বেসিক ট্রেনিং চলছে। পুলিশে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর আনসার ক্যাডারের প্রশিক্ষণও ঠিকমতো নিতে পারিনি। এখন পুলিশে যাওয়ার সুযোগও থাকল না।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার বিরুদ্ধে যদি নেতিবাচক কিছু থেকেই থাকে, আমি আনসারে চাকরি করছি কীভাবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নুরে আলমের ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের জন্য নয়, নিয়োগপ্রক্রিয়ার সামঞ্জস্য বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আনসার ও পুলিশ ক্যাডারের নিয়োগের শর্ত কিংবা যাচাইয়ের ভিত্তি এক ছিল কি না, সে তথ্য জানা নেই। তাই দুই নিয়োগের সিদ্ধান্তকে সরাসরি পরস্পরবিরোধী বলা যায় না। কিন্তু কেন একটি নিয়োগে তিনি যোগ্য বিবেচিত হলেন, আর অন্যটিতে বাদ পড়লেন—সেটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
ইফতেখারুলের চার বছরের স্বপ্নের কী হবে?
নাটোরের বাসিন্দা মো. ইফতেখারুল ইসলাম রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাঁর আরেকটি স্বপ্ন ছিল প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া। ৪৫তম বিসিএসে সেই ক্যাডারে চূড়ান্ত সুপারিশও পেয়েছিলেন তিনি। অথচ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার পর দেখেন, তাঁর নাম নেই।
ইফতেখারুল বলেন, ‘চার বছরের একটা লালিত স্বপ্ন এক রাতের ব্যবধানে ধূলিসাৎ হতে দেখা আসলে মেনে নেওয়ার মতো নয়। কেন চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েও বাদ পড়েছি, জানি না। আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল।’ একজন প্রার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার সব ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও যদি নিয়োগের কারণ জানতে না পারেন, তাহলে তাঁর সামনে প্রতিকার চাওয়ার পথ কতটা খোলা থাকে? ইফতেখারুলের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
৪৬ জন বাদ, সমালোচনার পর নিয়োগের ঘোষণা
গত সেপ্টেম্বরে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারে চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ৪৬ জনের নাম নিয়োগের প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়ে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দেন, বাদ পড়া ৪৬ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।
মন্ত্রী সে সময় বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও সঙ্গে বৈষম্য করা হবে না। তবে নিয়োগের আগে পুলিশি যাচাই নিয়মিত প্রক্রিয়া। যাচাই শেষ হওয়ার পর বাকি প্রার্থীদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এই ঘটনা সরকারি নিয়োগে যাচাইব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও একদল প্রার্থী কেন প্রজ্ঞাপনের বাইরে থাকবেন, তাঁদের বাদ পড়ার কারণ কী এবং সেই সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
তবে বিভিন্ন বিসিএসের সব ঘটনা একই রকম নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাদ পড়ার কারণ ও প্রমাণ আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেন অস্পষ্ট বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবির প্রশ্ন: মেধায় উত্তীর্ণ হলে নিয়োগ নয় কেন?
সরকারি নিয়োগে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এই ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হয় এবং এর মাধ্যমে বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হয়।
ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, যাচাই-বাছাইয়ের নামে অযথা হয়রানি ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমলাতন্ত্রে ব্যাপক দলীয়করণের জন্যও তিনি এই ব্যবস্থাকে দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘মেধার ভিত্তিতে যাঁরা কোয়ালিফাই করবে, তাঁদেরই চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে হবে।’
টিআইবির এই অবস্থান নিয়োগে মেধা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে আনলেও যাচাইব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটি হলো—প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত।
স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা ফিরবে কীভাবে?
সরকারি চাকরিতে প্রার্থীর পরিচয় ও তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ভুল তথ্য, অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত কিংবা বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে তা নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নইলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রার্থীদের নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
নুরে আলম ও ইফতেখারুল ইসলামের ঘটনায় সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো, তাঁদের বাদ পড়ার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁরা অন্য বিসিএসে সুপারিশ পেয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, অথচ ৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশের পরও নিয়োগ পাননি। তাঁদের বিরুদ্ধে কী তথ্য পাওয়া গেছে, সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় বাদ পড়া প্রার্থীদের কারণ জানানো, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আপিলের সুযোগ সহজ করা এবং ভুল হলে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। শুধু যাচাই করাই যথেষ্ট নয়; যাচাইয়ের সিদ্ধান্তও হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক।
কারণ, একটি গেজেটে নাম না থাকা কারও কাছে কেবল একটি চাকরি হারানোর ঘটনা নয়—তা হতে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন, কর্মজীবনের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের হিসাব ওলটপালট হয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের কারণই যদি অজানা থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: মেধা দিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও একজন প্রার্থীকে নিজের নিয়োগের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হবে কেন?
কালের আলো/আরআই/এমএসআইপি

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ