মুচি-ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে অপরাধের খোঁজ, কেন খুন হলেন আলিফ?

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন সীমান্ত এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল মাদক কারবার, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির সম্পর্কে এমন তথ্য জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রগুলো। অপরাধের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ার পর গুলিতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় এখন তাঁর শেষ অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য শত্রুদের নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলিফ লিখেছিলেন, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ……’। কিন্তু সেই তথ্য আর প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে তাঁর মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে, কোন অপরাধের তথ্য সামনে আনতে যাচ্ছিলেন তিনি? তাঁর অনুসন্ধান কি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিল?

মাদক কারবার, সীমান্তে চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে আলিফ হত্যার সরাসরি কোনো যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হত্যার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যে কারা রয়েছেন, তা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ

সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলে মাদক কারবার, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন আলিফ। অপরাধচক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পেতে তিনি কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ করতেন বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। আলিফের মৃত্যুর আগে তাঁর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজেও অপরাধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল। হত্যার আগের দিন দেওয়া পোস্টটি এ কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সহকর্মীদের মতে, পোস্টে উল্লেখ করা ‘অপরাধের গডফাদার’ এবং অপ্রকাশিত তথ্যের বিষয়বস্তু শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে

এ ক্ষেত্রে আলিফের ব্যবহৃত মুঠোফোন, কললিস্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, ব্যক্তিগত নোট এবং সংরক্ষিত প্রতিবেদন পরীক্ষা করে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের সূত্র পাওয়া যেতে পারে। তবে এসব তথ্যের কোনোটি এখন পর্যন্ত হত্যার কারণ বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করে না।

আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ

পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কারণে আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

এসব হামলার সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে আগের ঘটনাগুলো এবং হত্যার আগে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ঘোষণা—দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের মতে, শুধু সরাসরি হামলাকারীকে শনাক্ত করলেই হবে না; আলিফের আগের অনুসন্ধান, তাঁর ওপর হামলার ঘটনাগুলো এবং হত্যার আগে-পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। আগের হামলার ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত হয়ে থাকলে তার নথিও বর্তমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন

আলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কিছু অসংগতি পাওয়া যায়।

এর আগে একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। আলিফের ফেসবুক পেজে তাঁর মৃত্যুর আগে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও পোস্ট করেছিলেন তিনি।

জাতীয় পরিচয়পত্রের অপব্যবহারের প্রভাব ভোটার নিবন্ধনের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। ব্যাংক হিসাব খোলা, মুঠোফোনের সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে পরিচয়পত্র ব্যবহৃত হয়। ফলে ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি তৈরির অভিযোগের সত্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে আলিফের হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে—এমন প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি কারা আবেদন করেছেন, কীভাবে নথি যাচাই হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কারও অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পুরোনো তথ্যও আলোচনায়

সীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গাদের পরিচয়সংক্রান্ত অভিযোগের আলোচনায় কয়েক বছর আগের একটি মাদক মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অভিযানে বাবুল, তাঁর রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, মাদক ব্যবসার সুবিধা নিতে বাবুল ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।

বর্তমানে বাবুলকে ঘিরে যেসব অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে, তার মধ্যে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তাঁর আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। তবে অতীতের মাদক মামলার তথ্য কিংবা এসব অভিযোগের কোনোটিই আলিফ হত্যার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে না। এ কারণে পৃথক অভিযোগ ও ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তা অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।

হত্যার পরিকল্পনায় কারা, তদন্তে সেই প্রশ্ন

সাংবাদিক আলিফ হত্যার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের হামলাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সহকর্মীদের মতে, শুধু গুলি চালানো ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; হত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশদাতা, অর্থের জোগান এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলিফের সহকর্মীরা বলছেন, তাঁর শেষ অনুসন্ধান, আগের হামলার ঘটনা এবং হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার। তাঁদের মতে, আলিফ কোন তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন, তাঁর অনুসন্ধানের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন এবং আগের হামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ, মাদক সরবরাহ ও সীমান্ত অপরাধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

গ্রেপ্তার আসামির এক দিনের রিমান্ড

এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্গাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। ঘটনার পর শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্গাপুরে পুলিশের উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবার

আলিফের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে তাঁর সহকর্মীরা অপেক্ষা করছেন, তদন্তে তাঁর শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এবং হত্যার পেছনের কারণ স্পষ্ট হবে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে সরাসরি হামলাকারীর পাশাপাশি সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আলিফের আগের ওপর হামলার ঘটনাগুলো, তাঁর শেষ পোস্ট এবং অপ্রকাশিত অনুসন্ধানের তথ্য যাচাই করলে তদন্তে নতুন সূত্র মিলতে পারে। তবে মাদক কারবার, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন কিংবা রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ—কোনটির সঙ্গে আলিফ হত্যার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ওপর।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন