ঘরবাড়ি গিলছে ব্রহ্মপুত্র, বাঁচাতে মরিয়া কাঁচা-পাকা ধান

কুড়িগ্রাম,সংবাদদাতা কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:৪১ অপরাহ্ণ

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী গ্রামে গত এক সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ১৭টি পরিবারের বসতভিটা। একই সঙ্গে তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা আমন ধান, ভুট্টা ও শাকসবজির ক্ষেত। ঘরবাড়ি ও ফসল হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভাঙনের মুখে জমির কাঁচা-পাকা ধান দ্রুত কাটতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা।

ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নদী যেভাবে কৃষিজমি ও বসতভিটা গ্রাস করছে, তাতে অনেক পরিবারকে নতুন করে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, গত এক বছরেই এই এলাকায় প্রায় সাড়ে ৫০০ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে।

এক সপ্তাহে বিলীন ১৭ পরিবারের বসতভিটা

চর শৌলমারী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, গত এক সপ্তাহে তাঁর ওয়ার্ডের সুখেরবাতি এলাকায় সাতটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে বিলীন হয়েছে আরও ১০টি বাড়ি।

সুখেরবাতি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন দেলোয়ার, নজরুল ইসলাম, রুপচান, আয়শা খাতুন, ছোবহান ও লালু শেখ। অন্যদিকে খেদাইমারী এলাকায় কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, হাতেম, কদম আলী, আব্দুল খালেক, মহর উদ্দিন, সিরাজুল, জমসের আলী ও আক্কাস আলীর বাড়ি নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া চরে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন—এমন আরও দুই ব্যক্তির বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একের পর এক বাড়িঘর হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে।

ঘরবাড়ির সঙ্গে হারাচ্ছেন কৃষিজমি ও ফসল

নদীভাঙনে শুধু বসতভিটা নয়, কৃষিজমিও হারাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। আমন ধান ঘরে তোলার সময় ঘনিয়ে এলেও ভাঙনের কারণে অনেক জমির ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না। কোথাও কাঁচা ধান, কোথাও পাকা ধান নদীর গর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে যতটুকু সম্ভব ফসল বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে ধান কাটছেন কৃষকেরা।

ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, সুখেরবাতি এলাকার ইউনুছ মোল্লার দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদীতে বিলীন হয়েছে। ছবুর প্রামাণিকের চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া জমসের আলীর বসতভিটাসহ তিন বিঘা ধানি জমিও বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি জমি ও ফসল হারিয়ে এসব পরিবারের আর্থিক সংকট আরও বাড়ছে। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য জমি হারানো মানে শুধু চলতি মৌসুমের ফসলের ক্ষতি নয়, ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা।

জিও ব্যাগ ফেলেও থামছে না ভাঙন

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙন ঠেকাতে নদীতীরে জিও ব্যাগ ফেলেছিল। কিন্তু সেগুলোও নদীগর্ভে চলে গেছে। তাঁদের দাবি, যথাযথ তদারকি ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান বলেন, সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর এলাকায় ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্লকের কাজ না হওয়ায় জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আগে ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলেও এখন তা বন্ধ রয়েছে। ফলে যাঁরা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে নতুন করে ঘর তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থায়ী প্রতিরোধে প্রকল্পের প্রস্তাব, বরাদ্দ নেই জরুরি কাজের

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার জন্য বর্তমানে কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই।

তিনি জানান, স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে প্রকল্পটি কবে অনুমোদন পাবে, কখন কাজ শুরু হবে কিংবা ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো কত দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আসবে—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। এর মধ্যে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পুনর্বাসন ও দ্রুত প্রতিরোধব্যবস্থার দাবি

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে একের পর এক পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকেরা শেষ সম্বল ফসলটুকু রক্ষার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে নদী আরও জমি ও বসতভিটা গ্রাস করবে, বাড়বে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন