বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নিশি’ এবার জায়গা করে নিয়েছে রাশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ ‘ভিজিআইকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ৪৬তম আসরে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এই উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র। আগামী ১৬ থেকে ২০ নভেম্বর মস্কোতে অনুষ্ঠিতব্য উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে গোলাম রাব্বানী ও জহিরুল ইসলামের যৌথ পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি।
প্রথমবারের মতো ভিজিআইকে উৎসবে বাংলাদেশ
প্রযোজনা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া জানিয়েছে, রাশিয়ার বিখ্যাত গেরাসিমভ ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসরে নির্বাচিত হয়েছে ‘নিশি’। বিশ্বের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। ৪৬তম আসরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই অন্তর্ভুক্তিকে দেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি নির্মাতাদের কাজ তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণশৈলী বিশ্বদর্শকের সামনে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে এই অংশগ্রহণ।
চা-বাগানের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘নিশি’র গল্প
গোলাম রাব্বানীর গল্প ও চিত্রনাট্যে নির্মিত ‘নিশি’তে উঠে এসেছে সিলেটের একটি চা-বাগানের পরিবারের জীবনসংগ্রাম। পানির সংকট কীভাবে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে এবং একটি শিশুর শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে পারে, সেই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে চলচ্চিত্রটির কাহিনি। গল্পে দেখা যায়, পানির অভাবে চা-শ্রমিকের মেয়ে নিশির লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে বাড়িতে একটি নলকূপ বসিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নাবালিকা নিশিকে বিয়ে করতে চায় কাঠ ব্যবসায়ী লালচাঁন। এমন পরিস্থিতিতে নিশি ও তার পরিবারের সামনে তৈরি হয় কঠিন বাস্তবতা। চলচ্চিত্রটিতে চা-শ্রমিকের জীবন, দারিদ্র্য, বিশুদ্ধ পানির সংকট, শিশুর শিক্ষার অধিকার এবং বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত গল্পটি সামাজিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে।
বাংলাদেশ ও ইউরোপের সহযোগিতায় নির্মাণ
‘নিশি’ নির্মিত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ, গ্রিন ফিল্ম স্কুল অ্যালায়েন্স এবং ইউনেসকো ঢাকার সহযোগিতায়। চলচ্চিত্রটির শুটিং হয়েছে সিলেটের একটি চা-বাগান ও আশপাশের এলাকায়। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ করেছেন পোল্যান্ডের লজ ফিল্ম স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী নাতালিয়া পুসনিক। শুটিং শেষে চলচ্চিত্রটির চূড়ান্ত সম্পাদনা, রঙের কাজ এবং শব্দ সংযোজন করা হয়েছে পোল্যান্ডের বিখ্যাত লজ ফিল্ম স্কুলে। বাংলাদেশে নির্মিত একটি গল্পের কারিগরি কাজ আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্পন্ন হওয়ায় চলচ্চিত্রটির নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা।
এর আগেও আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে ‘নিশি’
ভিজিআইকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম এমা অ্যাওয়ার্ড জিতে আলোচনায় এসেছিল ‘নিশি’। ওই পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া গ্রিন মন্টেনিগ্রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ১২তম আসরেও পুরস্কার পেয়েছে চলচ্চিত্রটি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবার রাশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নেওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘নিশি’।
নির্মাতার চোখে এই অর্জনের গুরুত্ব
চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে নির্মাতা গোলাম রাব্বানী আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিশি একের পর এক রেকর্ড গড়ছ, সত্যিই এটা আনন্দের খবর। এই অর্জন শুধু আমাকে নয় আমাদের ফিল্ম ইতিহাসকে বিশ্বের দরবারে সমৃদ্ধ করবে।’ চা-বাগানের একটি পরিবারের সংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নেওয়ায় বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা ও স্থানীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘নিশি’র ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সাফল্য বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। বিশেষ করে স্থানীয় গল্প, সামাজিক সংকট ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র যে আন্তর্জাতিক উৎসবেও দর্শক ও বিচারকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, এই অর্জন তারই একটি উদাহরণ। সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া।
কালের আলো/এসএআর/এসএ

বিনোদন প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৪৫ অপরাহ্ণ