দোতারায় সুর তোলেন, তবু দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা নেই রইচের

পাবনা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

একসময় তাঁর গান শুনতে ভিড় জমাতেন মানুষ। সেই গানই ছিল জীবিকার অবলম্বন। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। ডিজিটাল যুগে লোকসংগীতের কদর কমে যাওয়ায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছে পাবনার ঈশ্বরদীর লোকশিল্পী রইচ উদ্দিনের। শারীরিক অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও বেঁচে থাকার তাগিদে দোতারা হাতে পথে পথে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় বিভিন্ন স্থানে রইচ উদ্দিনের গান শুনতে মানুষের ভিড় জমত। গান গেয়েই ভালো আয়-রোজগার করতেন তিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে শারীরিক সক্ষমতা, কমেছে আয়ের সুযোগও। স্থায়ী কোনো কাজ করার সামর্থ্য না থাকায় এখন পথেঘাটে, ট্রেনে-বাসে কিংবা দর্শনীয় স্থানে গান গেয়ে যা পান, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাঁর সংসার।

রইচ উদ্দিন জানান, রেডিওর যুগ থেকেই রাস্তাঘাটে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। আগে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে ভালো আয় হতো। এখন আগের মতো শরীরে শক্তি পান না। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো আর বয়স বোঝে না। গান গাইতে ইচ্ছা না করলেও বেঁচে থাকার তাগিদে দোতারা হাতে তুলে নিতে হয় তাঁকে।

স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খেতে হয়। রইচ উদ্দিনের ভাষ্য, শেষ কোরবানির ঈদে গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন। এরপর আর সেই সুযোগ হয়নি। তাঁর কথায়, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শুক্র ও শনিবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও পাকশী রেলস্টেশনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের গান শোনান রইচ উদ্দিন। সারাদিন গান গেয়ে তাঁর আয় হয় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়েই চলে তাঁর ও পরিবারের জীবনযাপন।

ডিজিটাল যুগে লোকশিল্পীদের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে রইচ উদ্দিন বলেন, এখন তাঁর মতো শিল্পীদের গান আর আগের মতো কেউ শুনতে চান না। অনেকে গান গাইতে বলেন, কিন্তু টাকা না দিয়েই চলে যান। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন, অথচ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না। বর্তমানে তিনি কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা ভাতাও পাচ্ছেন না বলে জানান।

পাকশী রেলস্টেশনের বাদাম বিক্রেতা সালাম বলেন, সাধারণত শুক্র ও শনিবার রইচ উদ্দিন স্টেশনে আসেন। সারাদিন দোতারা হাতে গান গেয়ে যে সামান্য অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে দিন কাটান তিনি।

স্থানীয় চা-দোকানি বাবু শেখ বলেন, রইচ উদ্দিন প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে ঈশ্বরদীতে আসেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর দুই চোখে সমস্যা রয়েছে। তারপরও ভিক্ষা না করে মুর্শিদি, বাউল, লালন, পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি।

রইচ উদ্দিনের মতো লোকশিল্পীদের দুরবস্থা স্থানীয় সচেতন মহলেরও নজর কেড়েছে। তাঁদের মতে, লোকসংগীত দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ এসব গানের শিল্পীরা বার্ধক্যে এসে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তার অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জীবনের শেষ সময়ে এসে রইচ উদ্দিন যেন কিছুটা স্বস্তিতে বাঁচতে পারেন, সে জন্য বিত্তবান ব্যক্তি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর মতো অসচ্ছল লোকশিল্পীদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, রইচ উদ্দিন কোনো সরকারি ভাতা পান কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে তিনি ভাতা না পেয়ে থাকলে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন