পোলাও চালের বাজারে অস্বাভাবিক দাম, ৭ মাসে বেড়েছে ৯০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:৩২ অপরাহ্ণ

রাজধানীর বাজারে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দামে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা দিয়েছে। খোলা পোলাও চালের সর্বনিম্ন দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা হলেও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা চাল বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৩০ টাকায়। ফলে খোলা চালের দ্বিগুণেরও বেশি দামেও অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেটজাত পোলাও চাল কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সাত থেকে আট মাসে প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে খোলা চালের সর্বনিম্ন দামের ধরনটির ক্ষেত্রে একই সময়ে দাম বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা।

খোলা ও প্যাকেটজাত চালের দামে বড় ব্যবধান
বাজারে বর্তমানে খোলা পোলাও চালের তিনটি ধরন পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন মানের চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০ টাকায়। দ্বিতীয় ধরনের চালের দাম ১৬০ টাকা এবং তুলনামূলক ভালো মানের খোলা পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে।

অন্যদিকে চাষী, প্রাণ, রূপচান্দা, পুষ্টি ও ফ্রেশসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা চালের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩০ টাকা। এতে একই ধরনের চালের বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত পণ্যের দামের পার্থক্য নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগে খোলা নিম্নমানের পোলাও চাল ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকায়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২০ টাকা। বিপরীতে প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম একই সময়ে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দাম বৃদ্ধির পেছনে রপ্তানি ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ
রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোলাও চালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে দুটি বিষয় আলোচনায় রয়েছে। একটি হলো সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন, অন্যটি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ।

গত জুন ও জুলাই মাসে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাল রপ্তানির সময় দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস সর্বোচ্চ ৫০০ টন চাল রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে। এলিন ফুড প্রোডাক্টসকে ৪০০ টন এবং খান অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফ্রোজেন ফুড প্রসেসরকে ৩০০ টন রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে সুগন্ধি চালের দাম রপ্তানি অনুমোদনের কয়েক মাস আগে থেকেই বাড়তে শুরু করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শুধু রপ্তানির অনুমোদনই বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কারণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি, বলছে রপ্তানিকারক সমিতি
বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেনের দাবি, দেশে বছরে কমপক্ষে ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। সে হিসাবে বছরে প্রায় ছয় লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে।

তাঁর মতে, উদ্বৃত্ত চালের একটি অংশ রপ্তানি করা হলেও দেশের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। বরং বাজারের অস্থিরতা দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অন্যদিকে কিছু ব্যবসায়ীর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা বেশি থাকায় দেশের বাজারেও দাম বাড়ছে। এবার প্রতি কেজি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার। বর্তমান ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী, এর মূল্য কেজিপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা।

তবে রপ্তানিমূল্যের সঙ্গে দেশের খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য নির্ধারণে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যয়ের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

‘কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে
প্যাকেটজাত পোলাও চালের বাড়তি দামের কারণে অনেক ক্রেতা এখন তুলনামূলক কম দামের খোলা চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজধানীর মুগদা বাজার থেকে কেজিপ্রতি ১০০ টাকায় খোলা পোলাও চাল কিনেছেন লিয়াকত আলী।

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, খোলা পোলাও চাল যদি ১০০ টাকায় পাওয়া যায়, তাহলে প্যাকেটজাত চালের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা হওয়া উচিত। তাঁর মতে, কোনোভাবেই প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম ২৩০ টাকা হওয়ার কথা নয়। এর পেছনে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সিন্ডিকেট থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে এ ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

তবে এটি একজন ক্রেতার অভিযোগ; বাজারে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব বা ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

রপ্তানিকে অজুহাত হিসেবে দেখানোর অভিযোগ ক্যাবের
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান রপ্তানির কারণে চালের দাম বাড়ার যুক্তিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা রপ্তানিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের যুক্তিও তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধার জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।

দাম নিয়ন্ত্রণে নজরদারির দাবি
পোলাও চালের বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত পণ্যের দামের বড় ব্যবধান এবং কয়েক মাসে প্যাকেটজাত চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রপ্তানির অনুমোদন, উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার হিসাব এবং বাজারে সরবরাহের প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনা করে দাম বৃদ্ধির কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে চালের উৎপাদন থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্যতথ্য যাচাই, মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট থাকলে তা শনাক্ত করা এবং প্রকৃত কারণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন