বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এআইয়ের ডেটা ব্যবসা, ২৯ বছরেই মেটার নেতৃত্বে কে এই ওয়াং

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:০২ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দুনিয়ায় সাফল্য মানেই শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন নয়; সেই প্রযুক্তিকে শেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা প্রস্তুত করাও হতে পারে বড় ব্যবসার ভিত্তি। এই সম্ভাবনাই অল্প বয়সে চিনতে পেরেছিলেন আলেকজান্ডার ওয়াং। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই শুরু করেছিলেন এআইয়ের ডেটা নিয়ে কাজ। সেই উদ্যোগই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার নেতৃত্বের পর্যায়ে।

মাত্র ২৯ বছর বয়সে ওয়াং এখন মেটার এআই কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর এই উত্থান একদিকে যেমন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প, অন্যদিকে তেমনি এআইশিল্পে ডেটা, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগের বাড়তে থাকা গুরুত্বেরও প্রতিফলন।

১৯ বছর বয়সেই চিনেছিলেন সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়ার সময় ২০১৬ সালে বন্ধু লুসি গুওকে সঙ্গে নিয়ে স্কেল এআই প্রতিষ্ঠা করেন আলেকজান্ডার ওয়াং। পরে ব্যবসার প্রসারে মনোযোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছিল। কিন্তু এআই মডেলকে কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দিতে প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ নির্ভুল ও সুশৃঙ্খল ডেটা। ছবি, ভিডিও কিংবা অন্যান্য তথ্য শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করে মডেলের উপযোগী করে তোলার কাজটিকেই ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখেন ওয়াং।

শুরুতে স্বচালিত গাড়ির প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ডেটা প্রস্তুতের সেবা দিত স্কেল এআই। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ের মতো কাজেও যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বেড়েছে, নির্ভরযোগ্য ডেটার চাহিদাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, শক্তিশালী কম্পিউটার কিংবা উন্নত অ্যালগরিদম থাকলেই একটি মডেল কার্যকর হয় না; তাকে শেখানোর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত তথ্য। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই স্কেল এআইয়ের ব্যবসা বড় হতে থাকে।

২৪ বছরেই বিলিয়নিয়ার
স্কেল এআইয়ের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ওয়াংকে প্রযুক্তি খাতের আলোচিত উদ্যোক্তাদের একজন করে তোলে। অল্প বয়সেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত সম্পদ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ২৪ বছর বয়সে তিনি নিজের উদ্যোগে বিলিয়নিয়ার হওয়া বিশ্বের অন্যতম কমবয়সী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পান।

তবে ওয়াংয়ের সাফল্যের গল্প কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উদ্যোগ দেখিয়েছে, প্রযুক্তির মূল পণ্য তৈরির বাইরেও সেই পণ্যকে কার্যকর করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বড় ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব। এআইয়ের ক্ষেত্রে ডেটা প্রস্তুত ও মূল্যায়নের কাজ একসময় প্রযুক্তির আড়ালে থাকলেও এখন তা শিল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় ডেটার মান, প্রক্রিয়াকরণ এবং নির্ভরযোগ্যতা ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

স্কেল এআইয়ে ১৪.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ মেটার
ওয়াংয়ের ক্যারিয়ারে বড় মোড় আসে ২০২৫ সালে। সে বছর মেটা স্কেল এআইয়ে ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির ৪৯ শতাংশ অংশীদারত্ব নেয়। চুক্তির সময় স্কেল এআইয়ের মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। এরপর ওয়াং মেটার এআই কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠানটির সুপারইন্টেলিজেন্স উদ্যোগের নেতৃত্বের দায়িত্ব পান। ফলে তাঁর ভূমিকা আর শুধু একটি ডেটা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এআই কৌশল নির্ধারণের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে তাঁর নাম।

ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে মেটার জন্য উন্নত এআই মডেল তৈরি, দক্ষ গবেষক ও প্রকৌশলী নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ওয়াংয়ের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

এআইয়ের লড়াই এখন মেধা ও বিনিয়োগেরও
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা এখন বহুমাত্রিক। কে বেশি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারবে, কে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনতে পারবে এবং কার প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন কাজকে আরও সহজ করবে—এসব প্রশ্নের পাশাপাশি দক্ষ কর্মীদের নিজেদের দলে আনার প্রতিযোগিতাও চলছে। এ ক্ষেত্রে ওয়াংয়ের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। প্রযুক্তির সম্ভাবনা বোঝার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কৌশল, দক্ষ দল গঠন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

মেটার এআই পরিকল্পনায় ওয়াংয়ের ভূমিকা তাই শুধু মডেল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, দক্ষ জনবল আকৃষ্ট করা এবং ভবিষ্যতের এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

সাফল্যের সঙ্গে রয়েছে নৈতিকতার প্রশ্ন
এআইয়ের জন্য ডেটা সংগ্রহ ও প্রস্তুতের ব্যবসা যত বড় হচ্ছে, ততই সামনে আসছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য ব্যবহারের নীতি এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন। স্কেল এআইয়ের কাজ ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রতিবেদনগুলোতে ডেটা প্রস্তুতের কাজে যুক্ত কর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। এসব প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস, ব্যবহারের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ, এআইয়ের অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই। প্রযুক্তিটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কোন ধরনের তথ্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণদের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে ওয়াংয়ের গল্পে?
আলেকজান্ডার ওয়াংয়ের যাত্রা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—প্রযুক্তির পরিবর্তনের মধ্যে নতুন সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারা একটি বড় দক্ষতা। তিনি এআইয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ার আগেই বুঝেছিলেন, মডেলকে কার্যকর করতে মানসম্মত ডেটা অপরিহার্য। সেই প্রয়োজনকে ঘিরেই গড়ে তুলেছিলেন নিজের ব্যবসা।

তবে তাঁর সাফল্য দেখে সবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত—এমন নয়। বরং তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে নিয়মিত শেখা, বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং নিজের দক্ষতাকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ২৯ বছর বয়সে মেটার এআই কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ওয়াংয়ের গল্প তাই শুধু একজন তরুণ বিলিয়নিয়ারের উত্থান নয়। এটি এমন এক প্রযুক্তিশিল্পের চিত্র, যেখানে ডেটা, মেধা ও সঠিক সময়ে সুযোগ শনাক্ত করার ক্ষমতা ভবিষ্যতের বড় ব্যবসা গড়ে দিতে পারে।সূত্র: রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান

কালের আলো/এসএ/জেএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন