একটি দুর্ঘটনা, ১৪টি প্রাণহানি। নাটোরে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে আবারও স্পষ্ট হলো সড়কে বেপরোয়া গতির মাশুল কতটা ভয়াবহ। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। প্রাথমিকভাবে দ্রুতগতিতে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। যাত্রীদের দাবি, দুর্ঘটনার সময় বাস চালাচ্ছিলেন চালকের পরিবর্তে সুপারভাইজার। তদন্ত শেষ হয়নি, কিন্তু প্রশ্নটি পুরোনো—প্রতিদিন এত প্রাণ ঝরার পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না কেন?
- ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয় জরিমানার উদ্যোগ
- দেশজুড়ে ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি ফিটনেস, প্রশিক্ষণ ও আইন প্রয়োগে কার্যকর পরিবর্তনের তাগিদ
- মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, চালকের ক্লান্তি ও অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়ে গেলে কতটা বদলাবে বাস্তবতা?
মৃত্যুর এই বাস্তবতার মধ্যেই সমাধান হিসেবে সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা। দেশের ৬৪ জেলা, সব মহানগর ও মহাসড়ককে নজরদারিতে আনতে ১০ লাখ ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। সম্ভাব্য ব্যয় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। লক্ষ্য, আগামী দুই বছরের মধ্যে ক্যামেরা স্থাপন শেষ করা। নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রমসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা হবে। কিন্তু সড়কে মৃত্যুর কারণ যখন শুধু অতিরিক্ত গতি নয়, তখন ক্যামেরার এই বিশাল নেটওয়ার্ক কতটা বদলাতে পারবে বাস্তবতা? ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা, ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো ও দুর্বল আইন প্রয়োগের মতো সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া প্রযুক্তি কি একাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পারবে?
মৃত্যুর সংখ্যা বলছে, সংকট গভীর
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, এটিই সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনের বছরে নিহতের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৫। আট বছরের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ১৩৮, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৯১৮, ২০২১ সালে ৫ হাজার ৮৪, ২০২২ সালে ৪ হাজার ৬৩৬, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ২৪ এবং ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৮০ জন নিহত হন। অর্থাৎ, কিছু বছরে সংখ্যা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্প সমন্বয়কারী শারমিন রহমান জানান, বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী অতিরিক্ত গতি। ১৯৯৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার ভূমিকা ছিল।
এশিয়ান ট্রান্সপোর্ট অবজারভেটরির ২০২৫ সালের রোড সেফটি প্রোফাইল অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রতি ১ হাজার কিলোমিটার সড়কে প্রায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে ৩১ হাজার ৫৭৮ জন নিহত হন। নিহতদের ৫০ শতাংশের বেশি পথচারী, সাইকেল আরোহী ও মোটরসাইকেলচালক। উচ্চগতির সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাঁরাই।
২৫০ কিলোমিটারে নজরদারি, সামনে পুরো দেশ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটারে ১ হাজার ৪২৭টি এআই ও ট্রাফিক নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট চালু হয়েছে স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা। নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে চলাচলসহ বিভিন্ন আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধিত মালিককে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদের দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ক্যামেরা চালুর পর চালকদের সচেতনতা বেড়েছে এবং দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সব মহাসড়ককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উবারচালক আনোয়ারের অভিজ্ঞতায়ও নজরদারির প্রভাব দেখা যায়। সম্প্রতি ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাওয়ার সময় ক্যামেরার উপস্থিতি মাথায় রেখে তিনি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি না চালানোর বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। তাঁর মতে, জরিমানার ভয়ে দূরপাল্লার চালকেরাও এখন গতিসীমা মানতে বেশি সচেতন হচ্ছেন।
এআই ক্যামেরা নম্বর প্লেট শনাক্ত, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং সন্দেহজনক গতিবিধি চিহ্নিত করতে পারে। ফলে আইন প্রয়োগ দ্রুত ও তথ্যনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ক্যামেরা স্থাপনের পর দুর্ঘটনা কতটা কমেছে, তা নিশ্চিত করতে আগের ও পরের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান এবং আইন লঙ্ঘনের তথ্য তুলনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা ফলাফল ছাড়া প্রযুক্তির সাফল্যের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
ক্যামেরার চোখ এড়ালেও ঝুঁকি এড়ানো যাবে?
দেশে বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি বাস ও ট্রাক মেয়াদোত্তীর্ণ বলে জানা গেছে। অর্থনৈতিক আয়ু শেষ হওয়া এসব যানবাহন যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়, পাশাপাশি পরিবেশদূষণেও ভূমিকা রাখে। একটি ক্যামেরা দ্রুতগতির গাড়ি শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক সারাতে পারে না। চালকের অদক্ষতা দূর করতে পারে না, দীর্ঘ কর্মঘণ্টাজনিত ক্লান্তি কমাতে পারে না, মেরামত করতে পারে না ভাঙাচোরা সড়কও।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দুর্ঘটনার ১৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ওভারলোড, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
এই তালিকা দেখায়, দুর্ঘটনা শুধু চালকের ভুলের ফল নয়; পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও এর পেছনে কাজ করে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আইন প্রয়োগে জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ঝুঁকির বড় অংশ থেকেই যাবে।
বিনিয়োগের হিসাব নয়, জরুরি প্রাণ বাঁচানোর ফল
১০ লাখ ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের সঙ্গে ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, জরিমানার স্বচ্ছতা, ভুল শনাক্তকরণের বিরুদ্ধে আপিল এবং তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
নাটোরের দুর্ঘটনায় বাস চালানোর দায়িত্বে কে ছিলেন, কেন সংঘর্ষ ঘটল এবং কোন কোন নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যর্থ হলো—তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি। দায় নির্ধারণ ও কার্যকর ব্যবস্থা না হলে দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা থেমে যাবে, কিন্তু ঝুঁকি থেকে যাবে।
সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ—প্রযুক্তির মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা এবং পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দূর করা। সড়কে নিরাপত্তার সাফল্য ক্যামেরার সংখ্যা দিয়ে নয়, মাপতে হবে কমে আসা দুর্ঘটনা, কমে আসা প্রাণহানি এবং কার্যকর জবাবদিহি দিয়ে।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:২০ অপরাহ্ণ