৯৪ শতাংশ কাজ শেষ, তবু প্রকল্পে ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:২০ অপরাহ্ণ

প্রকল্পের প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ। হাজার হাজার সড়ক ও সেতুর নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি কিছু কাজ আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। এরপরও প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন করে প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩’ বা আইআরআইডিপি-৩-এর তৃতীয় সংশোধনীতে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি নিয়ে আপত্তি উঠলেও সংশোধনী অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।

মূল ব্যয়ের তুলনায় বাড়ছে ৬৩ শতাংশ
২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৪৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা করা হয় এবং মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এবার তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ১০ হাজার ৫২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সংশোধিত ব্যয় আগের অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়বে। মূল প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ৬৩ শতাংশ। পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কাজ প্রায় শেষ, নতুন করে যুক্ত হচ্ছে হাজার কিলোমিটার সড়ক
প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় থাকা ৭ হাজার ২৯১টি স্কিমের মধ্যে ৬ হাজার ৩৪৪টির কাজ শেষ হয়েছে। আরও ৭৯৫টির কাজ চলমান। বিভিন্ন কারণে ২২টি স্কিম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে জানানো হয়েছে।

সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। মোট ১১ হাজার ১৩৬ মিটার সেতুর মধ্যে ১০ হাজার ৯৬৪ মিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজের একটি অংশও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এত অগ্রগতির পরও তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন করে ৪৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ২১১ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক, ২ হাজার ৪৯৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ১ হাজার ১০ মিটার সেতু-কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২৯৯ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজও যুক্ত করতে চায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এত বিপুল পরিমাণ নতুন কাজ যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ও কাজ নির্বাচনের ভিত্তি নিয়ে পিইসি সভায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এমপিদের চাহিদা পূরণে পুরোনো প্রকল্প সম্প্রসারণের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে এলাকায় উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতেই পুরোনো প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংসদীয় আসনগুলোতে নতুন প্রকল্প নেওয়া না হওয়ায় নির্বাচনের পর এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়নকাজ দেখাতে না পারার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নকাজের চাহিদা পূরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির চাপও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নতুন প্রকল্প অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সে কারণে বিদ্যমান প্রকল্পের আওতায় নতুন কাজ যুক্ত করলে তুলনামূলক দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

তবে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসার পর নতুন করে বিপুল অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ   বলেন, বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে এসে প্রকল্পে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো এবং মেয়াদ সম্প্রসারণের প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর এত বছর পেরিয়ে নতুন করে বিপুল অর্থ চাওয়াকে তিনি সুযোগের অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন।

তাঁর মতে, পুরোনো প্রকল্পের কাঠামোর ওপর নতুন কাজ যুক্ত করে সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডিসহ নতুন প্রকল্প গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণে সংসদ সদস্যদের কোনো চাপ বা দাবি থাকলেও পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব হবে অর্থনৈতিক যুক্তি ও নিয়মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাজনৈতিক প্রভাব বা কোনো গোষ্ঠীর আনুকূল্যে উন্নয়ন ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনা কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইএমইডির আপত্তি: নতুন প্রকল্প নেওয়াই যুক্তিসংগত
প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে সবচেয়ে বড় আপত্তি এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে। পিইসি সভায় সংস্থাটির প্রতিনিধি মত দেন, নতুন করে প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় না করে বর্তমান প্রকল্পটি শেষ করা উচিত। প্রয়োজন হলে নতুন প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

আইএমইডির যুক্তি, প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে প্রায় সাত বছর হতে চলেছে। আরও মেয়াদ বাড়ালে প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত সড়কগুলোর গুণগত মান চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন হতে পারে। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ সাধারণত তিন বছরের মধ্যে রাখার কথা। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প চালু থাকলে নির্মাণসামগ্রীর দর ও অন্যান্য ব্যয় পরিবর্তনের কারণে ব্যয় সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে সে কারণে প্রকল্পের পরিধি অনবরত বাড়ানোর পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের পরিধি কমিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আইএমইডির মতে, আটটি বিভাগের জন্য একই ধরনের পৃথক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার কার্যক্রমও চলছে। ফলে বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

পিইসি সভাপতির ব্যাখ্যা: দ্রুত উন্নয়নকাজ শুরু করতেই উদ্যোগ
প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন এলাকা ও কাজ যুক্ত করার বিষয়ে পিইসি সভার সভাপতি মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা তৈরি ও বাস্তবায়ন শুরু করতে প্রায় এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে নতুন সরকারের কাছে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নকাজের চাহিদা এসেছে। এসব কাজ দ্রুত শুরু করা এবং নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চলমান প্রকল্পে নতুন কিছু কাজ ও এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।তাঁর দাবি, জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রায় ছয় মাস ধরে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। তাই বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি।

দরপত্র ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নির্দেশনা
নতুন কাজের বাস্তবায়ন ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রসঙ্গে মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে মূল্যায়ন কমিটি যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদার নির্বাচনে কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পিইসি সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় খাত, কাজের স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়ন তদারকি নিয়ে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে গাছ লাগানোর হিসাব, বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও কাজের মান নিশ্চিত করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। এলজিইডির এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটটি বিভাগের জন্য একই ধরনের পৃথক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন