নীল চা পান করলে শরীরে কী হয়, জানুন উপকারিতা ও সতর্কতা

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:৪৬ অপরাহ্ণ

চায়ের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা দীর্ঘদিনের। তবে লাল চা কিংবা দুধ চায়ের বাইরে এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে নানা ধরনের ভেষজ পানীয়। এর মধ্যে অন্যতম অপরাজিতা ফুলের নীল চা। উজ্জ্বল নীল রং, সহজে রং বদলে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণের কারণে পানীয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু এই চা কি সত্যিই শরীরের নানা উপকার করে, নাকি এর গুণাগুণ নিয়ে রয়েছে অতিরঞ্জিত প্রচারণা?

অপরাজিতা ফুল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচিত উদ্ভিদ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাতেও ফুলটির বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। প্রাথমিক কিছু গবেষণায় জারণরোধী কার্যকারিতা, রক্তে শর্করার পরিবর্তন, প্রদাহ এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মনে রাখতে হবে, অপরাজিতা চা কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়।

নীল রঙের পেছনে রয়েছে বিশেষ উপাদান
অপরাজিতা ফুলের আকর্ষণীয় নীল রঙের অন্যতম কারণ অ্যান্থোসায়ানিন। এটি উদ্ভিদে থাকা এক ধরনের প্রাকৃতিক রঞ্জক, যার জারণরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ফুলটিতে কুয়ারসেটিন, ক্যামফেরল ও মাইরিসেটিনের মতো আরও কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

নীল চায়ের বিশেষত্ব হলো, এতে লেবুর রস মেশালে রং বদলে বেগুনি কিংবা গোলাপি হয়ে যেতে পারে। লেবুর অম্লীয় উপাদানের প্রভাবে ফুলের রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসায় এমনটা ঘটে।

তবে শুধু রং কিংবা প্রাকৃতিক উপাদানের উপস্থিতি থেকেই কোনো পানীয়ের স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মানুষের ওপর পরিচালিত নির্ভরযোগ্য গবেষণা।

শরীরের কোষের সুরক্ষায় কতটা কার্যকর?
শরীরে বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় অস্থিতিশীল অণু তৈরি হয়। এগুলো অতিরিক্ত জমলে কোষের ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষতিকর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা জারণরোধী উপাদান।

২০১৮ সালে ১৫ জন সুস্থ পুরুষের ওপর পরিচালিত একটি ছোট গবেষণায় অপরাজিতা ফুলের নির্যাস পরীক্ষা করা হয়। এতে রক্তের জারণরোধী ক্ষমতার কয়েকটি সূচকে উন্নতির পাশাপাশি কোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সূচকে হ্রাস দেখা যায়।

গবেষণাটি আশাব্যঞ্জক হলেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং পরীক্ষার সময়কালও ছিল সীমিত। তাই নিয়মিত নীল চা পান করলে দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কি ভূমিকা আছে?
অপরাজিতা চায়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র হলো রক্তে শর্করার মাত্রা। ছোট একটি মানব গবেষণায় চিনি গ্রহণের সঙ্গে অপরাজিতা ফুলের নির্যাস নেওয়ার পর খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের বৃদ্ধিতে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।

তবে এই ফলকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। গবেষণাটি সীমিতসংখ্যক সুস্থ মানুষের ওপর করা হয়েছিল। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পানীয়টি কতটা কার্যকর বা নিরাপদ, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের পরিবর্তে অপরাজিতা চা পান করা উচিত নয়।

প্রদাহ কমানোর সম্ভাবনা
শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অংশ হলো প্রদাহ। আঘাত বা সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

অপরাজিতা উদ্ভিদের নির্যাস নিয়ে প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় প্রদাহ কমানোর সম্ভাব্য প্রভাব দেখা গেছে। তবে প্রাণীর শরীরে পাওয়া ফল মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই অপরাজিতা চা বাত, সন্ধির ব্যথা কিংবা অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগ সারাতে পারে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

স্মৃতিশক্তি ও মানসিক প্রশান্তিতে উপকার?
লোকজ চিকিৎসায় অপরাজিতা ফুলের ব্যবহার নিয়ে স্মৃতিশক্তি, উদ্বেগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার মতো বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় উদ্ভিদটির প্রচলিত ব্যবহার ও এ-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়।

পরবর্তী কিছু পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণাতেও অপরাজিতার সম্ভাব্য স্নায়ুরক্ষাকারী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, মন শান্ত রাখা কিংবা উদ্বেগ কমানোর ক্ষেত্রে নীল চা কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিত করার মতো বড় পরিসরের গবেষণা এখনো সীমিত।

অর্থাৎ, সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে; কিন্তু একে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী?
অপরাজিতা ফুলে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার ক্ষেত্রেও গবেষণা হয়েছে। কিছু পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় রক্তের চর্বি, রক্তে শর্করা এবং জারণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে এসব ফল মানুষের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে প্রযোজ্য কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাই নীল চা হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করে বা হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার নিশ্চয়তা দেয়—এমন দাবি করা যাবে না।

শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভেষজ পানীয়কে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়। অপরাজিতা চা নিয়েও এমন দাবি দেখা যায়। কিন্তু শরীর থেকে সব ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই চায়ের কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

মানবদেহে যকৃৎ ও বৃক্কসহ বিভিন্ন অঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য ও বিপাকজাত পদার্থ অপসারণে কাজ করে। তাই শরীর পরিষ্কার করার অলৌকিক পানীয় হিসেবে নীল চাকে দেখার পরিবর্তে এর প্রাকৃতিক উপাদান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখা জরুরি।

চিনি ছাড়া পান করাই ভালো
অপরাজিতা ফুলের চা স্বাভাবিকভাবেই ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ পানীয় হিসেবে গ্রহণ করা যায়। ফলে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান এমন ব্যক্তিদের জন্য এটি একটি বিকল্প হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরি বেড়ে যায়। তাই স্বাদ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিনি ছাড়া বা অল্প চিনি দিয়ে পান করা যেতে পারে। লেবুর রস যোগ করলে স্বাদের পাশাপাশি পানীয়টির রঙেও পরিবর্তন আসে।

যেকোনো ভেষজ পানীয়ের ক্ষেত্রেই ব্যক্তিভেদে সহনশীলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ কোনো রোগ থাকলে, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলে কিংবা গর্ভাবস্থায় এটি নিয়মিত বা ঘন নির্যাস আকারে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। অপরাজিতা চায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চমানের মানব গবেষণাও এখনো সীমিত।

সম্ভাবনা আছে, তবে প্রমাণের অপেক্ষা
নীল অপরাজিতা চায়ের আকর্ষণ শুধু এর দৃষ্টিনন্দন রঙে সীমাবদ্ধ নয়। এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগ বিজ্ঞানীদের আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রাথমিক গবেষণায় কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রমাণের বড় অংশই সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণা, পরীক্ষাগার কিংবা প্রাণীভিত্তিক পরীক্ষা থেকে এসেছে। তাই নীল চাকে অলৌকিক ওষুধ হিসেবে না দেখে ক্যাফেইনমুক্ত একটি ভেষজ পানীয় হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

কালের আলো/এসএ/জেএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন