পাকা ধানের স্বপ্ন ভেঙে নিচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:৫১ অপরাহ্ণ

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে ফসলি জমি হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। কারও জমিতে ধানের থোড় এসেছে, কোথাও আবার ধান পাকতে শুরু করেছে। এমন সময়ে একের পর এক আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় ফসল রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত দুই দিনে ভাঙনের কবলে পড়ে অন্তত ১০ একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ২০০ থেকে ২৫০ বিঘা ফসলি জমি রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে চলতি মৌসুমের ফসলের পাশাপাশি বসতভিটা ও আবাদি জমিও হারানোর আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

ফসলের মৌসুমে নদীভাঙনে দিশেহারা কৃষক
ভাঙনকবলিত এলাকার কৃষকদের জন্য চলতি মৌসুমের ধান ছিল পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম ভরসা। জমিতে ধানগাছে থোড় আসার পর ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু হঠাৎ ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল বলেন, গত দুই দিনে হঠাৎ নদীভাঙন বেড়েছে। ধানগাছে থোড় আসার মধ্যেই জমি ভাঙতে শুরু করেছে। তাঁর প্রায় দেড় একর জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। জমি নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় উপায় না পেয়ে ধানগাছ কেটে নিচ্ছেন তিনি। কৃষকদের আশঙ্কা, এভাবে জমি বিলীন হতে থাকলে শুধু চলতি মৌসুমের ফসলই নয়, ভবিষ্যতে চাষাবাদের জমিও হারাতে হবে। এতে তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

ঋণ করে চাষ, ফসল হারানোর শঙ্কায় পরিবারগুলো
একই এলাকার কৃষক মোসলেম আলী ও শফি নাইয়ার কণ্ঠেও হতাশা। তাঁরা জানান, ঋণ করে ধানের চারা কিনে জমিতে রোপণ করেছিলেন। সার, জ্বালানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এই জমির ফসল বিক্রি করেই তাঁদের সংসারের ব্যয় মেটানোর কথা ছিল।

কিন্তু ধানে থোড় আসার সময় নদীভাঙন শুরু হওয়ায় তাঁদের সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে বিনিয়োগ করা অর্থ ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনকি আগামী বছরের জন্য পরিবারের খাবারের ধান জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। কৃষকদের কাছে এই ক্ষতি শুধু জমি হারানোর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণ পরিশোধ, পরিবারের খাবার এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন।

এক বছরে কয়েক শ একর জমি বিলীন হওয়ার দাবি
এলাকাবাসীর দাবি, গত এক বছরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কয়েক শ একর আবাদি জমি ও শতাধিক বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীভাঙনের কারণে শৌলমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বসবাস ও কৃষিকাজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চারিপাড়া, বয়াতিপাড়া, শেখের বাজার এবং চর খেদাইমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ বসতি এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও জমি ও স্থাপনা হারানোর আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা তন্ময় হাসান তোতা বলেন, গত এক বছরে তাঁদের প্রায় ৪০ একর আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে। সুখেরবাতি ও মধ্যপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর ভাষ্য, পাশের চর খেদাইমারী এলাকায় বস্তা ফেলা হলেও সুখেরবাতি এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ফলে একের পর এক জমি হারিয়ে স্থানীয় কৃষকেরা বিপাকে পড়ছেন।

বস্তা ফেলেও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএইচএম সাইদুর রহমান জানান, গত দুই দিন ধরে ব্রহ্মপুত্রের ব্যাপক ভাঙন চলছে। ইউনিয়নের ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড অল্প কিছু বস্তা ফেললেও সেগুলো নদে চলে যাচ্ছে। ফলে এসব উদ্যোগে ভাঙন কতটা ঠেকানো যাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এলাকাবাসীর মতে, নদীভাঙন প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নভাবে বস্তা ফেলার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ফসল ঘরে তোলার এই সময়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া গেলে কৃষকদের ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

অর্থসংকটে প্রতিরক্ষা কাজ আটকে আছে
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, অর্থসংকটের কারণে আপাতত চর প্রতিরক্ষায় কাজ করার সুযোগ নেই। মূল নদের তীর রক্ষার কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে তাঁদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, একদিকে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিরোধমূলক কাজের সীমাবদ্ধতার কথা জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জমি ও ফসল রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগের দাবি
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কুড়িগ্রামের কৃষকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ফসল ও আবাদি জমি রক্ষা করা। জমি হারালে শুধু একটি মৌসুমের আয় নয়, দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঋণ করে চাষ করা কৃষকদের জন্য এই ক্ষতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভাঙনের মুখে থাকা আরও ২০০ থেকে ২৫০ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন