প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগারের বাইরে নিজের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টায় ধানের ২৫টি নতুন জাত উদ্ভাবনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেরপুরের কৃষক সেন্টু কুমার হাজং। এর মধ্যে ২২টি জাতই আমন ধান। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কৃষিতে নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে তার এই উদ্যোগ এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাঁদকুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু কুমার হাজং। ধান নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জাত উদ্ভাবন করেছেন। তার উদ্ভাবিত ধানের মধ্যে রয়েছে চিকন ও মোটা দানার পাশাপাশি সোনালি, লালচে ও কালো রঙের ধান। জাতভেদে গাছের গঠন ও ফলনের বৈশিষ্ট্যেও রয়েছে পার্থক্য।
কৃষকের উদ্যোগ দেখতে গেলেন জেলা প্রশাসক
সেন্টু কুমার হাজংয়ের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তার বাড়িতে যান শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। সেখানে তিনি সেন্টুর উদ্ভাবিত ধানের বিভিন্ন জাত ও কৃষি কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ধানের জাতগুলো উদ্ভাবনের পেছনের অভিজ্ঞতা, গবেষণাপদ্ধতি এবং কৃষিকাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে চান। একজন কৃষকের নিজস্ব উদ্যোগে এতগুলো জাত উদ্ভাবনের বিষয়টি কৃষিতে তৃণমূল পর্যায়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণার শুরু
সেন্টু কুমার হাজংয়ের পড়াশোনা এসএসসি পর্যন্ত। এরপর একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তিনি প্রাথমিক কৃষি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) অধীনে ব্রিডিং বা প্রজনন বিষয়ে ১০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং ধানের গাছ ও ফলন সম্পর্কে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে এ কাজ তার আগ্রহ ও নিয়মিত চর্চার অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ধান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে ২৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রঙ ও দানার বৈচিত্র্যে আলাদা ধানের জাত
সেন্টুর উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর মধ্যে দানার আকার, রং ও গাছের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রয়েছে। কোনো জাতের ধান চিকন, কোনোটি মোটা দানার। আবার কোনো জাতের দানায় সোনালি রং, কোনোটি লালচে কিংবা কালো। গাছের বৈশিষ্ট্য ও ফলনের ক্ষেত্রেও জাতভেদে পার্থক্য দেখা যায়। এ ধরনের বৈচিত্র্য ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে উদ্ভাবিত জাতগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষের উপযোগী কি না, ফলন কেমন এবং রোগবালাই ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর—এসব বিষয় নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের মাধ্যমে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সেন্টুর উদ্ভাবিত জাতগুলো সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের এমন সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কৃষির উন্নয়নে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বাইরে একজন কৃষকের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। যথাযথ কারিগরি সহায়তা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের সুযোগ পেলে সেন্টু কুমার হাজংয়ের উদ্ভাবিত জাতগুলো আরও বৃহৎ পরিসরে পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেলে বাড়তে পারে সম্ভাবনা
কৃষিতে নতুন জাত উদ্ভাবন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং স্থানীয় কৃষির বৈচিত্র্যের প্রশ্নও জড়িত। তবে কোনো নতুন জাতকে ব্যাপকভাবে চাষের উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করার আগে তার ফলন, গুণগত মান, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বিভিন্ন পরিবেশে অভিযোজনক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। সেন্টু কুমার হাজংয়ের উদ্যোগকে তাই সম্ভাবনাময় একটি কৃষি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গবেষণা, কারিগরি সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের সুযোগ পেলে তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

শেরপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:০০ অপরাহ্ণ